শনিবার, ১৬ জুন, ২০১২


এম আবদুল হাফিজ
অন্তত প্রধান দুই দলের রাজনীতিতে নেই কোনো অভিনবত্ব বা বৃত্তবন্দি রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার সাহসী উদ্যোগ। শীর্ষ নেতৃত্ব ভুগছে প্রতিহিংসার এক প্রকার দুরারোগ্য বিকারে। সম্প্রতি ১৮ দলীয় জোটের গণসমাবেশ এবং তা ভণ্ডুল করতে মহাজোট তথা আওয়ামী লীগের প্রাণান্তকর চেষ্টা সেটাই প্রমাণ করল। ফরাসি অভিব্যক্তি 'ডেজা ভ্যু', যা বহুল পরিচিত কোনো কিছুর পুনঃদর্শন বোঝায়। সেই অনুভূতি নিয়েই দেখলাম ১১ জুনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের অঘোষিত হরতাল ও সমাবেশে বিএনপির অক্ষম আস্ফালন। দেখলাম সেই বহুল পরিচিত রাজনৈতিক দৃশ্যপট, যা আমরা গত দু'দশকের 'গণতান্ত্রিক' বাংলাদেশে দেখে আসছি। অবশ্য বিএনপির মেয়াদেও এসব ছিল। তবে এখনকার দুর্বল এ সংগঠনটিকে আরও দুর্বল করতে এবং বেকায়দায় ফেলতে আওয়ামী লীগ যেসব হয়রানিমূলক পদক্ষেপ বেছে নিয়েছে তা জিঘাংসারই বহিঃপ্রকাশ। স্পষ্টতই বিএনপিকে অনিশ্চয়তায় ভোগাতে বা শেষ সময়ের প্রস্তুতিতে দলটিকে বেকায়দায় রাখতে কর্তৃপক্ষ শেষ দিনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ঝুলিয়ে রেখেছে বিএনপিকে সমাবেশ করার অনুমতি না দিয়ে। বিরোধী দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে মামলায় জড়িয়ে আন্দোলনের গতি ও গতিবেগ স্তিমিত করার অপচেষ্টার কথা বাদই দিলাম। যতক্ষণ আওয়ামী লীগের হাতে সেসব করার ক্ষমতা আছে, তারা তা করবেই। বিশেষ করে যখন বিএনপিও ক্ষমতায় থাকতে সেসব করেছে। শুরুতেই বলেছি, সেই একই প্রতিহিংসার রাজনীতির বৃত্তে এ দেশ ঘুরছে, যা প্রশমিত হওয়ার পরিবর্তে মাঝে মধ্যেই জিঘাংসার পর্যায়ে পেঁৗছে যায়।
গণসমাবেশ নিয়ে শুরু করেছিলাম। যদি ক্ষমতাসীনদের সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতার বিষয়টি বিবেচনায় আনা যায়, তাহলে এ সমাবেশে বিএনপির সাফল্য শতকরা ১০০ ভাগ। যদিও নিন্দুকরা সুচের পেছনে ছেদা আবিষ্কারেও ব্রতী হয়েছে। বিএনপির একটি 'ক্যালিব্রেটেড মডারেশন'কে তাদের কাছে অক্ষম আস্ফালন মনে হয়েছে। তবে বিজ্ঞজনদের মতে, বিএনপির মডারেশন সময়োচিত হয়েছে।
একটি চলমান আন্দোলনের গতি, প্রকৃতি এবং কৌশল রাজনীতির অনেক উপাদানই নির্ণয় করে থাকে। রমজান মাসের প্রাক্কালে এবং গ্রীষ্মের এই তাবদাহে আন্দোলনের কোনো কঠোর পদক্ষেপ বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল জনগোষ্ঠীর কাছেও বিরক্তিকর হতো। তাছাড়া আন্দোলনের মেজাজকে ধরে রাখতে নেতৃত্বকে অনেক কথা বলতে হয়, যা অনেক সময় বাস্তবায়নের ঊধর্ে্ব। আওয়ামীরা এত সত্বর তাদের হাস্যকর ট্রাম্পকার্ড রাজনীতির কথা ভুলে গেল?
আমার কাছে হাস্যকর লাগে, যখন বাঘা বাঘা আওয়ামীকে বলতে শুনি, আসলে বিএনপির আন্দোলনের কোনো ইস্যু নেই। প্রকৃতপক্ষে ইস্যুর আধিক্যে বিএনপির জন্য সবচেয়ে মারাত্মক ইস্যু বাছাই দুরূহ হয়ে পড়েছে। শুধু দেশের সামাজিক শৃঙ্খলা ও অবক্ষয়ের বিষয়টিই যদি ধরা যায় এর বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা নিয়ে বছরের পর বছর আন্দোলন চলতে পারে। যুগ যুগ ধরে যে কোনো গণতান্ত্রিক দেশে এসব নিয়ে আন্দোলন দেশবাসীর গণতান্ত্রিক অধিকার। ক্ষমতাসীনরা দেশের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে ব্যর্থতার ভেতর দিয়ে সমস্যাগুলোকে এতটাই লেজেগোবরে করে ফেলেছে, সেগুলোকে সুবিন্যস্ত করে একটি শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে অফফৎবংং করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
আমরা উৎসুক এমন পরিবর্তন দেখতে, যার মধ্যে মেধা ও পরিপকস্ফতার ছাপ থাকবে। আন্দোলন মানেই রাজপথভিত্তিক উত্তাপ নয়, সেটা তো সংসদের পরিসরেও হতে পারে। বিএনপির মধ্যে বেশকিছু প্রতিশ্রুতিশীল পার্লামেন্টারিয়ান আছেন, যাদের বুদ্ধিমত্তার উপস্থাপনা জাতি দেখতে চায়। গণতন্ত্র কিন্তু সবসময়ই সংখ্যাতত্ত্বের ওপর নির্ভরশীল নয়। শানিত বুদ্ধি, যুক্তি ও বাগ্মিতা অনেক সময় একটি দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। তেমন কিছু পার্লামেন্টারিয়ান পাকিস্তান আমলে রাওয়ালপিন্ডিতেও সংসদের ফ্লোর কাঁপাত। আমরা আমাদের সংসদে সেসব উত্তপ্ত বিতর্কের ট্র্যাডিশন ফিরিয়ে আনতে পারি না কেন? আমরা সবসময়ই সংসদে শুধু স্তুতি, বন্দনা ও স্তাবকতাই দেখব?
আমরা প্রায় ভুলে যেতে বসেছি যে, প্রয়াত শহীদ সোহরাওয়ার্দী তার ব্যক্তিত্ব ও কৌশলে সামান্য কয়েকজন সদস্যের সমন্বয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্বের আসন দখল করেছিলেন। যে কোনো দলের জন্য সদস্য সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু গুণগতভাবে উন্নত একটি সরকার গঠনে গুণী এবং যোগ্য সাংসদ কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
বোঝা যায়, বিএনপি এখন মার্কটাইম করে নির্বাচন নিকটবর্তী হলে তুরুপের তাসটি ছাড়তে চায়_ আন্দোলন বা নির্বাচনে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে চায়। ইতিমধ্যে যদি দলটি সংসদের সঙ্গে খানিকটা সংশ্লিষ্ট হয়, তা হবে বাড়তি অর্জন।

ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম আবদুল হাফিজ
সাবেক মহাপরিচালক বিআইআইএসএস ও কলাম লেখক

শুক্রবার, ৮ জুন, ২০১২

মহাজোটের 'ফেইট অ্যাকমপ্লি' অর্জিত হয়নি


এম আবদুল হাফিজ
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের দৃষ্টি এখন সামনে। স্বভাবতই জোট এখন আগামীর হিসাব-নিকাশ কষছে। আসন্ন নির্বাচনে তার প্রসপেক্ট এবং তা আশানুরূপ না হলে গৃহীতব্য ব্যবস্থাগুলো এ সময়ে জোট অন্তর্ভুক্ত দলগুলোর নীতিনির্ধারকদের বিবেচ্য। জোটপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রীর জন্য বেশ আগেই নির্বাচনের কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে। তার উক্তি ও মেজাজে পরিস্ফুট যে, আগামী নির্বাচনটিও জিততে তিনি মরিয়া। একইভাবে মরিয়া বিরোধী দল ও তার নেত্রী খালেদা জিয়াও। কিন্তু জিতবে তো শুধু একটি পক্ষই। জেতার কৌশল নির্ধারণে বিরোধী দলের অনেক সীমাবদ্ধতা ও প্রতিবন্ধকতা, যার মধ্যে বিএনপি নিতৃত্বাধীন ১৮ দল এখন ফেঁসে আছে। পক্ষান্তরে ক্ষমতাসীনদের হাতে প্রাক-নির্বাচনী তৎপরতার জন্য অনেক কার্ড মজুদ আছে।
মহাজোট এখন একের পর এক সেই কার্ডই খেলছে। বিরোধী দলকে কোণঠাসা করতে ক্ষমতাসীনরা বিরোধীদলীয় শীর্ষ নেতাদের ইতিমধ্যে অজামিনযোগ্য মামলা দিয়ে কারার অন্তরালে পাঠিয়েছে। প্রচণ্ড দমননীতির জাঁতাকল এড়াতে বাকি নেতাকর্মীরাও ব্যাপকহারে গা-ঢাকা দিয়েছেন। ফলে রাজনীতির মাঠে এখন ক্ষমতাসীনরাই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
কিন্তু তলে তলে ক্ষমতাসীনরা যে মারণাস্ত্রটি বিরোধীদের জন্য উঁচিয়েছে তা হলো নির্বাচন কার অধীনে হবে তার একটি আইনি ও সাংবিধানিক সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে। বিগত কয়েকটি নির্বাচন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে হলেও মহাজোট ক্রমবর্ধমান ব্যর্থতায় ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে আর তত্ত্বাবধায়কের ওপর ভরসা করতে পারছে না। যে আওয়ামীরা একযুগ আগে তত্ত্বাবধায়কের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল, তাদেরই এই পদ্ধতিতে এখন অরুচি কোনো শুভ সংকেত বহন করে না।
এক অনুগত বিচার ব্যবস্থার সহায়তায় এবং সংসদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এ ইস্যুতে তাদের সাফল্য আওয়ামীদের একটি ফেইট অ্যাকমপ্লি অর্জিত হয়েছে বলে তারা ভেবেছিল। আরও ভেবেছিল যে, এভাবে পরিবর্তিত একটি পদ্ধতি অর্থাৎ দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে_ এ জন্য যে কেউ আরেকটি আইনি ও সাংবিধানিকভাবে সেটল্ড ইস্যু নিয়ে উচ্চবাচ্য করবে না। কিন্তু তেমনটি না হয়ে এখন নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতিই চলমান রাজনীতির সবচেয়ে বিতর্কিত ইস্যু। যদিও আত্মপ্রসাদে মগ্ন আওয়ামীরা এ ইস্যুতে বিরোধীদের কোনো পাত্তাই দিতে চাইছে না এবং একটি চণ্ডনীতির মধ্য দিয়ে বিরোধীদের দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচনের সিদ্ধান্তটিই গেলাতে চাইছে। কিন্তু সামষ্টিকভাবে তা হবে এই জটিল ইস্যুর একটি হাস্যকর সরলীকরণ।
দেশ-বিদেশের সকল মহল থেকেই সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবি এখন সর্বজনীন। মুখে আওয়ামীরা যতই হম্বিতম্বি করুক না কেন বাস্তবে দলের শক্তিতে, জনপ্রিয়তায় এবং গ্রহণযোগ্যতায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমানে সমান। কোনোটিকেই কোনোটির চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল ভাবা যাবে না। বাংলাদেশে আগ্রহী যে কোনো দেশ এবং দেশের অভ্যন্তরে সব মহলই এ সত্যটি অনুধাবন করে। কোনো সঙ্গত কারণে যদি বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক স্থাপত্য মুখ থুবড়ে পড়বে এবং এ দেশের সব গণতান্ত্রিক সম্ভাবনাই বিলুপ্তির মুখে পড়বে। তাই আগামী নির্বাচন কোন সরকারের অধীনে হবে, তা নিয়েই এত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।
বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অভিযাত্রা কখনোই মসৃণ বা কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। কিন্তু মহাজোটের আগামী নির্বাচনে জয়ের বিকার এবং অদম্য লিপ্সা জোটটিকে দিগ্গি্বদিক জ্ঞানশূন্য করে তুলেছে এবং অবাস্তব নির্বাচনী কৌশল প্রণয়নের পথে ঠেলে দিয়েছে। ফলে তা গ্রাউন্ট রিয়ালিটি থেকে সম্পূর্ণভাবে ছিটকে পড়েছে। এর আগে চারদলীয় জোটকেও এমন দশায় ফেলেছিল। তার পরিণতি আওয়ামী লীগসহ কারও কাছে অজ্ঞাত নয়। মহাজোট কি তাহলে সেই একই পথে এগোচ্ছে এবং একটি এক-এগারোর প্রাদুর্ভাব ঘটানোর প্রেক্ষিত তৈরি করছে?
আওয়ামী লীগ তো কোনো ফেলনা দল নয়। এই দলকে এমনটা মানায় না। দলটি যদি বিরোধীদের সঙ্গে একটি সমঝোতার পথে অগ্রসর হয়, চাই কি তাও আজকের ব্যর্থ মহাজোট সরকারের জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট হবে এবং তাদের নির্বাচনী প্রসপেক্টকে উজ্জ্বল করতে পারে। তার চেয়েও বড় কথা, একটি সমঝোতার পথের সঙ্গে এ দেশে গণতন্ত্রের অস্তিত্বও সম্পৃক্ত হয়ে আছে। কিন্তু যদি ক্ষমতার মদমত্ততায় হার্ডলাইনই প্রধানমন্ত্রীর পছন্দের পথ হয়ে থাকে তার জন্য অন্য অনেক ক্ষেত্র আছে, যেখানে ফলপ্রসূভাবে হার্ডলাইন প্রয়োগ হতে পারে। অন্তত মেয়াদের প্রায় অন্তিম সময়ে এসেও যদি আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট দেশজোড়া বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য ও নজিরবিহীন প্রশাসনিক অনিয়মের বিরুদ্ধে হার্ডলাইন গ্রহণ করতে পারে এবং দুর্নীতি ও দারিদ্র্যের দানবকে পরাভূত করতে পারে, কে জানে তা হয়তো আশাতীতভাবে তাদের নির্বাচনী সম্ভাবনাকে নতুন মাত্রায় পেঁৗছে দিতে পারে। কিন্তু যে কোনো অবস্থায় সাংঘর্ষিক নীতি পরিত্যাজ্য। চরম দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে তার মাশুল জনগণকে দিতে হয়। যাদের কাছে ক্ষমতাকাঙ্ক্ষী দলগুলোকে হাত পাততে হবে। এক্ষুণি ক্ষমতাসীনদের জন্য আত্মসন্তুষ্টির কোনো কারণ নেই। পূর্বাপর বিবেচনায় পুলকিত ও নিশ্চিন্ত থাকার জন্য ক্ষমতাসীনরা 'ফেইট অ্যাকমপ্লির' কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন না যতক্ষণ রাজপথে উত্তাপ স্তিমিত না হয় বা বিরোধী দল রণে ভঙ্গ না দেয়। এখনও অনেক কিছু ঘটার বাকি আছে। এ অবস্থায় ক্ষমতাসীনদের জন্য একমাত্র লাভজনক পথ একেবারেই শেষ বেলায় হলেও জনহিতকর কিছু কাজের উদ্যোগ গ্রহণ এবং বিরোধী জোটের সঙ্গে সমঝোতা। একইভাবে বিরোধী জোটও অনেক ক্ষতি ও দুর্ভোগ থেকে রক্ষা পাবে যদি তারাও 'এক দফার' বা সরকার পতনের আন্দোলন থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয় এবং বড় বড় বুলি আওড়ানো থেকে বিরত থাকে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম আবদুল হাফিজ :সাবেক মহাপরিচালক
বিআইএসএস ও কলাম লেখক

বৃহস্পতিবার, ৭ জুন, ২০১২

দেশে বহুমাত্রিক এক দুঃসময়!


॥ এম. আবদুল হাফিজ ॥


গ্রীষ্মের দাবদাহ, তীব্র লোডশেডিং ও রাজনৈতিক পারদের ঊর্ধ্বমুখীতায় প্রাণ ওষ্ঠাগত এ দেশের মানুষের। কোনো সঙ্কেত নেই যে, শিগগিরই এই অবস্থার কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন হবে। বরং ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অস্থিরতা সরকার থেকে ভিন্ন মতাবলম্বীদেরসহ বিরোধীদলীয় শীর্ষ নেতাদের ব্যাপক ধরপাকড় ইতোমধ্যে ত্রিশঙ্কু অবস্থায় নিপতিত দেশের অস্থিতিশীলতার নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দেশের নেতা-নেত্রীরা বারুদের ভাষায় কথা বলছেন, একে অপরকে শিক্ষা দিতে শাসাচ্ছেন এবং রাজপথ ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডল দখলে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তাদের মধ্যে সংঘর্ষের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠতে পারা মুহূর্তের ব্যাপার। অভিজ্ঞতা বলে যে, এ থেকেই রাজনৈতিক দাবানলের উৎপত্তি হবে। 
তা ছাড়াও নাগরিক জীবনের বেহাল অবস্থা তো আছেই। তা নিয়ে দেশবাসী আর মাথা ঘামায় না। এই জনমের কখন কোন সময়ে দুধকলা সহকারে ভাত বা চিঁড়া খেয়েছিল সেই সুখ স্মৃতির মধ্যে দেশবাসী তৃপ্তি খোঁজে। মহার্ঘতার কশাঘাতে জর্জরিত মানুষের যখন দু’বেলা পেট পুরে খেতে পারাটাই একটা বিরাট বিষয়, কয়েক ঢোক বিশুদ্ধ পানি পান করতে পারলেই তা হয় বিরাট প্রাপ্তি। তাই কখনো বাগে না আসা বাজারের বাজারদর নিয়েও মাথা ঘামায় না মানুষ। পেলে খায়, না পেলে চুরি করে, মার খায়। তা ছাড়া ভিক্ষাবৃত্তি তো আছেই।
তবু দেশবাসী ভোটের প্রাক্কালে হঠাৎ করেই গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী হয়। দেশের শীর্ষ নেতা-নেত্রীরা আসেন তাদের কুঁড়েঘরের দোরগাড়ায় ভোট ভিক্ষা চাইতে। এতে করেই তাদের পলিমাটির মতো মন বিগলিত হয়। একবার এদের ভোটে নির্বাচিত হয়েই সেই যে ডুমুরের ফুল হয়ে যায় দেশের দেশনেত্রী, দেশরতœ ও পল্লীবন্ধুরা, পাঁচ বছরেও এদের আর সাক্ষাৎ মেলে না। সেই সরলপ্রাণ ও অল্পেতুষ্ট দেশবাসীকে বারবার প্রতারিত করে এ দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব। আবার তারা সক্রিয় আগামী নির্বাচনের প্রাক্কালে। 
বলা বাহুল্য, ভোটের লড়াইয়ে আপাত ক্ষমতাসীনরাই এগিয়ে থাকে। হঙ্কার ও শাসানোতে এবারো আওয়ামীরাই অগ্রণী। তাদের তা করার রসদও আছে। ক্ষমতার দণ্ড যতক্ষণ হাতে আছে, তারাই লোককে অবলাইজ করতে পারে। পারে চাকরিবাকরি, ঠিকাদারি, ব্যবসায় ও ভালো নিয়োগ দিতে। কিছুই না হোক, কারো ফাই ফরমায়েশের জন্য হরহামেশা বিদেশ সফরকারী কর্তাব্যক্তিদের সাথে বিদেশে প্রমোদ ভ্রমণের জন্য পাঠাতে পারে। নিদেনপক্ষে গণভবন দর্শনের মওকা করে দিতে পারে খোদ প্রধানমন্ত্রীর অমৃতবাণী শোনার অসিলায়।
অবাক কাণ্ড ঘটেছে আমাদের দেশরতœ প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতায়। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের এক গ্যালাপ প্রতিষ্ঠান বলেছে, দেশে শতকরা ৭৭ ভাগ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাষ্ট্রনায়কদের শীর্ষে রয়েছেন। তাহলে আওয়ামীদের তো কেল্লা ফতেহ। তা হলে আর আওয়ামী নেতা-নেত্রী রোদে গরমে ঘর্মাক্ত কলেবরে এত দৌড়ঝাঁপ করছেন কেন? তা কি অবশিষ্ট শতকরা ২৩ ভাগ জনসমর্থন বিরোধীদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে? হয়তো বা।
কিন্তু আফসোস ! আওয়ামীরা এ দেশবাসীকে এতটাই বিচার-বুদ্ধিবর্জিত মনে করল কেন? দেশজ জনমত জরিপে তাদের জনপ্রিয়তার স্বরূপ বেরিয়ে আসত বলে একটি দুঃশাসনপীড়িত দেশবাসী তাদের দুঃখের কথাই অকপটে বলত বলে? এ পর্যন্ত তাদের আওয়ামী বিরূপতার প্রকাশ ঘটাত বলে? এ দেশের সব দল সংগঠনই ভুয়া সাফল্যের সার্টিফিকেট চায় এবং তা আমেরিকা, ব্রিটেন বা ইউরোপের হলে তারা বেশি আশ্বস্ত হয়, যদিও বা তা ভুয়া। এ দেশের মানুষের সত্য ভাষণ তাদের যম এবং তা তারা সযতেœ এড়িয়ে চলে।
অথচ আমাদের চাইতে কে ভালো বুঝবে যে দুঃশাসনের জ্বালা কী? তাতে কোন কোন দানবের সৃষ্টি হয়, দারিদ্র্য ও বৈষম্যের উৎস কোথায়, দুর্নীতির সংক্রমণ কোথা থেকে হয়। সুরঞ্জিত সেনরা কোন সংস্কৃতির সৃষ্টি? আলো-আঁধারির মতো তার মন্ত্রিত্ব যাওয়া ও আসার মধ্যে কোথাকার কলকাঠি নড়ে। দেশময় এত হত্যা ও অপহরণের রহস্য কী? ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলম উদ্ধার হন না, কিন্তু নদী-জলাশয়, ডোবা-গর্ত ও ক্ষেত-প্রান্তরে এত বেওয়ারিশ লাশের ছড়াছড়ি। পুরো দেশটাকে মনে হয় একটি বধ্যভূমি।
দিন যত পেরিয়ে যাবে, নির্বাচন আরো নিকটবর্তী হবে, ক্ষমতাসীনেরা ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার আরো আনকোরা নতুন নতুন কৌশলের উদ্ভব ঘটাবে। একই ক্ষমতাসীনেরা স্বাধীনতার ঊষালগ্ন থেকে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার ফন্দিফিকিরে লিপ্ত হয়েছিলেন এবং গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠিয়ে একদলীয় শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিলেন। এ কথা অনস্বীকার্য যে, এই দলটিই আবার স্বাধীনতা সংগ্রামেরও নেতৃত্ব দিয়েছিল। এই দলটিই গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের মূলনীতিকে সংবিধানভুক্ত করেও পরে এই নীতিগুলোকে বিসর্জন দিয়েছিল। জনগণ তবু বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে এই দলকে বারবার ক্ষমা করেছে। আওয়ামীরা কি মনে করে যে, জনগণ আবার তাই করবে?
দেশে এখন দুঃশাসন চলছে। শুধু নির্বাচিত পার্লামেন্ট থাকলেই গণতন্ত্র হয় না। গণতন্ত্র না থাকলে দেশে সুশাসনও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। চলমান দুঃশাসনের শেষ কী বা কোথায় অনুমান করাও কঠিন। কেননা দেশে কোনো কিছুর স্বাভাবিক প্রক্রিয়া সক্রিয় নেই। আমি সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজার কোনো ভক্ত-সমর্থক নই, তবু তিনি এক চমৎকার অভিব্যক্তিতে বর্তমান সরকারের কীর্তির প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আওয়ামীরা আর কিছু না পারুক, দেশটিকে ‘লণ্ডভণ্ড’ করে দিয়েছে। হ্যাঁ লণ্ডভণ্ডই বৈকি! সংস্কার সংশোধনের নামে তারা দেশের সংবিধানই শুধু নয়, অনেক মৌলিক ইস্যুতে জনমতের তোয়াক্কা না করে তাদের বা তাদের দেশী-বিদেশী বন্ধুদের স্বার্থে পদক্ষেপ নিয়েছে, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর। জানি না সেই বিচ্যুতিগুলো আদৌ কিভাবে দূর করা যাবে। যদিও বিএনপির ট্র্যাক রেকর্ড খুব ভালো নয়, কিন্তু এ সময়ে দলের মধ্যপর্যায়ের নেতৃত্বে কিছু প্রতিশ্রুতিশীল মুখের সন্ধান মেলে। রাজপথেও তারা দুর্বার। ভবিষ্যতে তারা কিসে পরিণত হবে এ মুহূর্তে তা বোধগম্য না হলেও গণতন্ত্রের খাতিরেই দেশে একটি বিরোধী সংগঠন থাকতেই হবে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে সরকারের একটি চণ্ড দমননীতি বিএনপির যে ক্ষতি করবে তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি করবে গণতন্ত্রের। সরকারের ইচ্ছা ও অনিচ্ছাকৃত বিপথগামিতাকে সে ক্ষেত্রে ধরিয়ে দেয়ার কেউ থাকবে না। সরকার ব্যক্তি ও দলগত স্বার্থ উদ্ধারে ইতোমধ্যেই বেপরোয়া। একটি বিরোধী দলবিহীন রাজনৈতিক শূন্যতায় আদর্শবিচ্যুত সরকারি দল তখন মেয়াদের বাকি সময়টুকু লুটেপুটে আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। তাহলে? সংলাপ? সেও আরেক মরীচিকা, যার পেছনে, হ্যামিলনের বংশীবাদকের পেছনে ছোটার মতো, ছুটছে বিভ্রান্ত কিছু লোক। 
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার এবং নিরাপত্তা, রাজনীতি, বৈদেশিক নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক

সোমবার, ৪ জুন, ২০১২

হ্যামিলনের বংশীবাদকরা!




এম আবদুল হাফিজ
খুব দুর্দিনে আছে এক সময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী বিএনপি। এতটাই যে, কোন মতে দলটি এখন তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে ব্যস্ত। দলটির সব শীর্ষ নেতাই এখন সরকারের গৃহীত হার্ডলাইন বা এক প্রচণ্ড দমননীতির শিকার হয়ে কারান্তরালে। অতি উৎসাহী দলীয় কর্মীরা বিক্ষোভ-আন্দোলন করতে চাইলেও আইন-শৃংখলা বাহিনীর পুলিশ-র‌্যাবসহ আওয়ামী ক্যাডাররা তাদের কোথাও দাঁড়াতেই দেয় না। পিটিয়ে রাজপথ থেকে তাড়িয়ে দেয়। বাদকরা অন্তরালে থাকলেও বাঁশির মূর্ছনা এদের শ্র“তিগোচর হয়েছে এবং তা তাদের বারবার ঘরছাড়া করে। বিএনপির সাম্প্রতিক কর্মসূচিগুলো তা-ই প্রমাণ করে। জ্যৈষ্ঠের দাবদাহ এবং খররৌদ্রের প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে কিছু প্রতিবাদী তর“ণ যেভাবে মারমুখো ‘আইন-শৃংখলা’ বাহিনীর সদস্যদের মুখোমুখি হয়েছে, তা অনেককেই অবাক করেছে। 
অনেকেই বলেন, আওয়ামীরাও এক সময়ে বিএনপির এমন চণ্ডরূপের মোকাবেলা করেছে। সে কথা সত্য। কিš‘ আজকের আন্দোলনের পরিধি বেশ কিছুটা বিস্তৃত। বিষয়টি আর অন্তঃদলীয় নয়। ন্যায়-অন্যায়ের অনেক ইস্যুই এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এর কারণ আওয়ামীরা এক সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য নিয়ে এদেশের মানুষের মননের বিপরীতে কিছু মৌলিক পরিবর্তনে হাত দিয়েছে, যা ঠেকানো একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে পবিত্র দায়িত্ব। সেই দায়িত্ববোধ থেকেও অনেকে প্রতিবাদের কাতারে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দাঁড়ান। অনেকেই তাদের সরল বিশ্বাস থেকে প্রশ্নের সম্মুখীন হন, এদেশ কি আবার বাকশালী আদলে ফিরে যাবে? অনেকে ভাবেন, এ দেশ কি আর আমাদের বিশ্বাসের ভিত্তিতে টিকে থাকবে। 
সময়ের এমনই এক সন্ধিক্ষণে হ্যামিলনের কিছু বাদক তাদের বাঁশিতে তান তুলেছে আরেক লড়াইয়ের জন্য বিদ্রোহী-প্রতিবাদীদের রাজপথে টেনে আনতে। রক্তচক্ষু সরকারের শাসানির মুখেও এরা ঘর ছাড়ছে। প্রত্যয়দীপ্ত কণ্ঠে তাদের সেই একই উ”চারণÑ সময় এখন মিছিলে যাওয়ার। যুগে যুগে এমনটাই হয়েছে। প্রতিবাদীরা তাদের পরিণতি নিয়ে কালেভদ্রে হিসাব-নিকাশ করে। করলে তারা এর প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে চাইত না। এটাকে শুধু এক সুন্দর আগামীর জন্য ঝুঁকি গ্রহণ বললে ভুল হবে। এটা রীতিমতো গ্যাম্বলিং। 
জুয়াতে স্টেইক থাকে। আজকের এই মারমুখী রাজনীতিতেও স্টেইক আছে। এবং তা উভয় প্রধান দলের জন্যই আছে। রাজনীতিতে অনেক কিছুই উহ্য থাকে। প্রকাশ্যে দু’দলই দেশ ও জনগণের জন্য সমর্পিত প্রাণ। উভয়েই গণতন্ত্রকে নিষ্কলুষ করতে চায়। কিš‘ অন্তরে তাদের ক্ষমতা প্রলম্বিত ও দখল করার লিপ্সা। রাজনীতির আরেক গুর“ত্বপূর্ণ পক্ষ জনগণ। তাদেরও রাজনীতির চলমান খেলায় স্টেইক আছে। রাজনৈতিক খেলার সুবাদে তারাও তাদের ভাগ্যোন্নয়নের চেষ্টায় প্রবৃত্ত হয়। এমন একটি দলকে তারা দেশ পরিচালনার জন্য বেছে নেয়, যেটি তাদেরকে তাদের ঈপ্সিত শাসন উপহার দিতে পারে, যদিও অতীতে কোন দলই তা পারেনি বা দেয়নি। তবু তারা একটি আশাবাদ গিয়ে রাজনীতির খেলায় শরিক হয়। 
আওয়ামীদের দিয়েই এদেশে দেশ শাসন শুর“ হয়েছিল। এখন তারা তৃতীয় মেয়াদে দেশ শাসন করছে। তাদের দেশ শাসনের রেকর্ড কোন সময়ই উৎসাহব্যঞ্জক হয়নি। কর্তৃত্ববাদী এ দলটি দেশ ও জনগণের কল্যাণে বেশি কিছু দেয়নি। কিš‘ তাদের উক্তি-উ”চারণে অন্য চিত্র। তারা ক্ষমতায় এলেই নাকি জনগণ কিছু পায়। অন্যরা ক্ষমতায় আসে শুধু লুটপাটের জন্য। এই ‘পাওয়ার’ তাদের নিজস্ব ব্যাখ্যা আছে। কিš‘ আসলে দলীয় নেতাকর্মীরাই কিছু পায়। তারাও তো জনগণের অংশ। কিš‘ জনগণের স্বার্থে আওয়ামীরা কদাচিৎ কিছু করেছে। তারা যে অন্ধকারে ছিল তা আরও ঘনীভূত হয়েছে, তারা যে দারিদ্র্যে ছিল তা আরও প্রকট হয়েছে। 
একই রেকর্ড বিএনপির দেশ শাসনেরও। তখনও ব্যাপক দুর্নীতি, দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্য ছিল। ‘দেশনেত্রী’ তার শাসনামলে একইভাবে ক্ষমতার দাম্ভিকতায় ছিলেন এবং বিরোধীদের তু”ছ-তা”িছল্য তার শাসন-শৈলীর অংশ ছিল। উ”ছৃঙ্খল এক ‘হাওয়া ভবন’ রহস্য কাহিনী এখনও ত্রাসের সঞ্চার করে। সে সময়কার ‘বিদ্যুৎ’ কেলেংকারি, মুদ্রা পাচার এবং স্বজন তোষণ কম নিন্দিত হয়নি। তবে বেগম খালেদা জিয়ার একটি গুণ অনেকেরই দৃষ্টি এড়ায়নি। রাষ্ট্র পরিচালনায় নেতা-নেত্রীদের এবং কর্তাব্যক্তিদের প্রয়োজনে বিদেশ ভ্রমণ জর“রি। কিš‘ এখনকার মতো প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে তাদের বিদেশ ভ্রমণের নামে ‘প্রমোদ ভ্র্রমণের’ এত আধিক্য ছিল না। কেননা খালেদা জিয়া স্বয়ং অনেকটাই ভ্রমণবিমুখ। 
শাসকগোষ্ঠী যে পথেই চলুক না কেন, সরকারের বিচ্যুতি ও বিপথগামিতার বির“দ্ধে সো”চার তো হবেই প্রতিবাদী তার“ণ্য। তাই আন্দোলন কোন কোন সময়ে দলমতের ঊর্ধ্বে থেকে প্রতিবাদের ভাষা উ”চারণ করে। এ মুহূর্তেও তাই হ”েছ এবং হবে। জনজীবনের অশেষ ভোগান্তি রাজনৈতিক ইস্যুর সঙ্গে একাকার হয়ে এক সার্বজনীন ক্ষোভে-দ্রোহে পরিণত হ”েছ। তারই বিস্ফোরণোš§ুখ প্রকাশ আমরা রাজপথে দেখি। অবশ্য ক্ষমতাসীনদের সুসংগঠিত বিক্ষোভ-আন্দোলনে একই প্রকার দ্রোহ থাকবে না বরং এক ধরনের প্রভুভক্তি ও কৃতার্থতার প্রকাশ থাকবে তাদের ‘কার্য সম্পাদনে’। বাংলাদেশ প্রচণ্ড বিদ্রোহী ও হীনতম তাঁবেদারের আবাসভূমি। 
প্রতিবাদীদের কাছে তাদের আন্দোলন-বিক্ষোভ, ন্যায়-অন্যায়ের যুদ্ধে নিষ্কলুষ ন্যায়ের পক্ষে। ন্যায়ের পক্ষে থাকার একটি মনস্তাত্ত্বিক শক্তি আছে, যা ক্ষমতাসীনদের বির“দ্ধে একটি অসম যুদ্ধে প্রতিবাদীদের চালিকাশক্তি জোগায়। একটি অদৃশ্য অপরাধবোধ নেপথ্যে কাজ করে বলে ক্ষমতাসীনদের দলীয় ক্যাডারদের সব সময় যুদ্ধের রক্ষণভাগে থাকতে হয় এবং ‘ভাড়াটে’ ভূমিকায় থাকার হীনমন্যতায় ভুগতে হয় এবং তাদের আচরণ স্বতঃস্ফূর্ততা পায় না। 
পুরো বিষয়টাকে আমরা যে দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখি না কেন, আগামী দিনগুলো অর্থাৎ দশম সংসদের নির্বাচনকাল পর্যন্ত সময়টি ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধই থাকবে। কেননা উভয়পক্ষেই এ সময়ে নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে ঝুঁকি অনেক প্রকট। কোন পক্ষই দায়-দায়িত্বের এই ঝুঁকি নিতে চাইবে না। রাজনীতিকরা হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতো রাজপথ গরম রাখতে স্ব-স্ব কর্মীবাহিনীকে ঘরছাড়া করে রাজপথে জমায়েত করতে তাদের বাঁশিতে এক প্রকার মায়াবী তান তুলবে। এতেই এক অবাধ্য তার“ণ্য দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য হয়ে রাজপথে ছুটবে। 
সংলাপবাদীরা কী করছেন এ সময়ে? হিলারি ক্লিনটন থেকে ড্যান মজিনা এবং আমাদের সুশীলসমাজ ও বিশিষ্টজনেরা? সংলাপ এমনিতে হয় না। সংলাপের পর্যায় পর্যন্ত আসতেও অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। রাজপথে অনেক তুলকালাম ঘটার পরই রথী-মহারথীরা এখন সংলাপের কথা বলছেন, যদিও এর যৌক্তিকতা অনেক আগেই অনুভূত হয়েছিল। সুতরাং এটা বোঝা যা”েছ যে, রাজপথের পর্বটা অসমাপ্ত থাকার কারণেই সংলাপের জিগিরটা উত্থাপিত হওয়ার অপেক্ষায় ছিল। 
মানুষের কল্যাণ অত সহজে না হলেও তার প্রতিবিধানে অনেক চড়াই-উৎরাই আছে। আশাবাদ বুকে পুষে সেই দুর্গম পথ পাড়ি দিতেই হয়। সেই পথ পাড়ি দেওয়ানোর জন্য অক্লান্ত রাজনৈতিক বংশীবাদকরা তাদের বাঁশিতে তান তোলেন। এখনও, এ মুহূর্তেও সেই প্রক্রিয়াই চলমান।
এম আবদুল হাফিজ : নিরাপত্তা বিশ্লেষক, কলাম লেখক

শুক্রবার, ১ জুন, ২০১২

বাংলাদেশে দুই নেত্রীর মেগালোম্যানিয়া

এম আবদুল হাফিজ
খালেদা জিয়ার বিদ্যা-বুদ্ধির পরিমাণ নিয়ে এখন আর কেউ প্রশ্ন তোলে না। তোলা সমীচীনও নয়। যিনি একাধিকবার দেশের প্রধানমন্ত্রিত্বের মুকুট পরিধান করেছেন, তার ওই পদ অলঙ্কৃত করার যোগ্যতা সম্পর্কে কোনো বিতর্ক হাস্যকর। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে 'দুই নেত্রীর দ্বন্দ্ব' শিরোনামে যুক্তরাজ্যের দ্য ইকোনমিস্ট নেত্রীদ্বয়ের তুলনামূলক গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্যের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। স্মৃতি থেকে উদৃব্দত করছি, তাই অবিকল শব্দ চয়নে কিছু ভ্রান্তি থাকলেও থাকতে পারে। দ্য ইকোনমিস্ট লিখেছিল :কযধষবফধ তরধ যধং রসঢ়ৎবংংরাব সধহবৎরংস যিরষব যবৎ ৎরাধষ ঝযবরশয ঐধংরহধ রং সড়ৎব বফঁপধঃবফ ধহফ ষড়াবং ঢ়ড়ষরঃরপধষ ফবনধঃব.
কিন্তু খালেদা জিয়ার ম্যানারিজম বা শেখ হাসিনার বিতর্কপ্রীতি এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। তাদের উভয়ের মধ্যে যে একটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান, তার ওপর কিঞ্চিৎ আলোকপাতই এখানে উদ্দেশ্য। ক্ষমতায় এলেই তাদের মধ্যে যে মারাত্মক মেগালোম্যানিয়ার প্রকাশ ঘটে, সেটাই দেশের রাজনীতিকে অস্থির, অশান্ত ও টালমাটাল করে তোলে। উভয়েরই বিশ্বাস, তারা জনপ্রিয়তা, জনসমর্থন এবং দেশ শাসনের নিখুঁত কারিগর হিসেবে অনেক শক্তির অধিকারী; যদিও বাস্তবে তা দৃশ্যমান নয়। তাদের এ বিশ্বাসই সমঝোতার সব দুয়ার বন্ধ করে দেয়। উস্কে দেয় এক ভয়াবহ সাংঘর্ষিক রাজনীতির। যে অবস্থার কবলে দেশ আজ নিপতিত। অথচ উভয়েরই দুঃশাসন ও ব্যর্থতা দেশবাসীর অজ্ঞাত নয়। জনগণ হাড়ে হাড়ে জানে, দুই নেত্রীকে পর্যায়ক্রমে ক্ষমতাসীন করে কী পরিমাণ খেসারত তাদের দিতে হয়েছে! কিন্তু মেগালোম্যানিয়ায় আক্রান্ত নেত্রীদ্বয়ের এ দেশের ক্ষমতার মসনদে আরোহণ তাদের বিকৃত ধারণায় তাদেরই প্রাপ্য। জনগণ তাদের নেত্রীকে তার প্রাপ্য আসনে ভোটের মাধ্যমে পেঁৗছে দিয়ে শুধু তাদের দায়িত্ব পালন করেছে। এ ধারণায় তাদের ক্ষমতাসীন নেত্রীদ্বয়ের কাজ এখন শুধু তাদের প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা, যার জন্য তাদের নিজ মেধা ও যোগ্যতাই যথেষ্ট। নিজেদের বড় এবং শক্তিশালী ভাবার এ বাতিক বাংলাদেশে রাজনীতির সব অনর্থের মূল। এ বাতিক যে কাউকে রাজনীতিসহ ক্ষমতার যে কোনো লড়াইয়ে বাতিকগ্রস্তকে বেপরোয়া করে তোলে এবং তার বা তাদের মাত্রাজ্ঞান লোপ পায়_ এতে কোনো সন্দেহ নেই। অনেককে অপ্রিয় লাগলেও এমনই এক মাত্রাজ্ঞানহীন রাজনৈতিক সংঘর্ষ এ দেশকে আর্থ-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিয়েছে, যার পরিণতি ভয়াবহ। যেভাবেই হোক, এ প্রবণতাকে ঠেকাতে না পারলে সর্বনাশা সংঘাত দেশের সব সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করবে। এ জন্য দেশের বিজ্ঞজনকে দলবিশেষের জন্য পক্ষপাতকে পরিহার করে দক্ষ রেফারির ভূমিকায় অনতিবিলম্বে নামতে হবে।
খালেদা জিয়া তার বিগত শাসনামলে এমন বাতিকের বশবর্তী হয়ে প্রতিপক্ষের সঙ্গে তুচ্ছাতিতুচ্ছ আচরণ করেছিলেন এবং তা রাজনৈতিক উত্তাপকে শুধু বাড়িয়েছিল। অনেক ফন্দি-ফিকির করেও তিনি বা তার জোট ক্ষমতায় থাকতে পারেনি; না ক্ষমতার প্রলম্বন ঘটাতে পেরেছিলেন। ক্ষমতা প্রলম্বিত করতে একই প্রকার মানসিক বিকারে ভুগছেন এখনকার প্রধানমন্ত্রী। বেগম জিয়ার মতো তিনিও প্রতিপক্ষকে তীব্র-তীক্ষষ্ট কটাক্ষবাণে ঘায়েল করছেন এবং ভাবছেন যে, তার চাতুর্য কেউ বোঝে না। তিনি হয়তো ভাবেন_ তিনি অতি কৌশলী, জনপ্রিয় এবং শক্তিশালী। ক্ষমতার অন্তিম সময়ে এসে সবাই এমন ভাবেন। কিন্তু প্রায় ক্ষেত্রেই বাস্তবতা একই রকম_ শেষ পর্যন্ত তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে তাদের স্বপ্ন, সাধ এবং কল্পনাবিলাস। এ ছাড়া দুই নেত্রীর ক্ষেত্রেই রয়েছে আরেক মারাত্মক উপসর্গ_ নারী নেতৃত্বের জেদ ও একগুঁয়েমি।
যে কোনো দেশে, যে কোনো সময়ে ব্যর্থ সরকারগুলোর জন্য যখন পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যেতে থাকে, তাদের আচরণ ও প্রতিক্রিয়া হয় অভিন্ন। তারা সবকিছুর মধ্যে ষড়যন্ত্র দেখতে পায়, যার ওপর ভিত্তি করে তাদের দমন নীতিগুলো প্রয়োগ হতে থাকে। এ ছাড়া এমন সরকারগুলো শুধু নিজেদের ছাড়া আর কাউকে দেশপ্রেমিক ভাবতে পারে না। হঠাৎ তারা উচ্চকণ্ঠ হয়ে পড়ে এবং হুমকি-ধমকি ও শাসনের আশ্রয় নেয়। এ ছাড়াও পুলিশ-র‌্যাবের ওপর সরকারের নির্ভরতা বেড়ে যায়। তারাও কিছু প্রাপ্তির আশায় কারণে-অকারণে নিরীহ সাংবাদিক, এমনকি আদালতে বিচারপ্রার্থীদেরও পেটাতে শুরু করে।
আদালত প্রাঙ্গণের পুলিশ ক্লাবে এক নারী বিচারপ্রার্থীর শ্লীলতাহানির মতো কেলেঙ্কারি হয়। তার ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। একটি সমর্থনহীন সরকার শুধু পুলিশের এবং স্তাবকদের ওপর নির্ভর করে টিকতে পারে না; ফন্দি-ফিকিরের মাধ্যমে প্রলম্বিতও হতে পারে না। কিন্তু মেগালোম্যানিয়া তো একটি মানসিক ব্যাধি। মানসিক বিকার ইত্যাদি প্রচণ্ড ধাক্কায়ই দূর হয়। যেমন ২০০৭ সালে জোট সরকারের অনেক দেরিতে হলেও হুঁশ হয়েছিল। কেউ কখনও সীমাহীন শক্তির অধিকারী হতে পারে না, যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারে না। কোনো না কোনো সময় তাদের যুক্তির কাছে, ন্যায়ের কাছে অবনত মস্তক হতেই হয়। সমসাময়িক ইতিহাস তার প্রমাণ। গাদ্দাফি অনেক অস্ত্রবল, প্রাণ বাজি রাখা সমর্থক এবং কূটকৌশল দিয়েও শেষ রক্ষা পাননি। তাই নমনীয়তার ভেতর দিয়ে এবং যুক্তির পথ ধরে এগোলে রাজনীতির দুই পক্ষই মুখোমুখি সংলাপে জটিল সমস্যার জট খুলতে পারেন। সেটিই হবে নেত্রীদ্বয়ের বিকারমুক্ত চিন্তার পরিচায়ক।

ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম আবদুল

হাফিজ :সাবেক মহাপরিচালক বিআইআইএসএস ও কলাম লেখক

বৃহস্পতিবার, ৩১ মে, ২০১২

মৃত্যুপুরীতে বসবাস

এম আবদুল হাফিজ
এ দেশের মানুষের কাছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদ্য প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনটি কোন অভিনব বার্তা বহন করে না। তারা হাড়ে হাড়ে বোঝে ও জানে বিচারবহির্ভূত হত্যা-ম”ছবের তথ্য এবং নীরবে অন্তরে বহন করে এসব হত্যার দুঃসহ স্মৃতি ও কষ্ট। এর আগেও দেশী-বিদেশী মানবাধিকার সং¯’াগুলো একই প্রকার তথ্য বাংলাদেশ সম্বন্ধে তুলে ধরেছে, যার প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়ায়ও এ দেশে মানবাধিকার পরি¯ি’তির ভয়াবহতা কোন গুর“ত্ব পায়নি। এমন প্রতিবেদন বারবার প্রকাশিত হওয়ার পরও ক্রসফায়ার, পুলিশ হেফাজত বা রিমান্ডে নির্যাতনজনিত মৃত্যু হ্রাস পাওয়া তো দূরের কথা, এসবের মাত্রা বরং বেড়েই চলেছে। বেড়ে চলেছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সামাজিক অ¯ি’রতা এবং আইন-শৃংখলা বাহিনী বিশেষ করে এলিট ফোর্স র‌্যাবের বাড়াবাড়ি। প্রকারান্তরে দেশ পরিণত হয়েছে পুলিশ নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রে, যেখানে যুক্তির ভাষা বল প্রয়োগে স্তব্ধ হয়েছে। একটি ক্ষমতা মদমত্ত সরকার যেন যুদ্ধ ঘোষণা করেছে তারই কাছে নিরাপত্তা প্রার্থী জনগণের বির“দ্ধে।
তাই চারদিকে এত মৃত্যুর ছড়াছড়ি। এই মৃত্যুর অনেক সংবাদ অজ্ঞাত থেকে গেলেও মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা যেটুকু অবহিত হই, সেটাই যথেষ্ট একথা প্রমাণ করতে যে, আমরা যেন এক সাক্ষাৎ মৃত্যুপুরীর মধ্যেই অব¯’ান করছি। সংবাদপত্রে আমরা যেসব বেওয়ারিশ লাশ, খণ্ডিত মৃতদেহ, গলিত-অর্ধগলিত লাশের পথেঘাটে, খানাখন্দে, ডোবা-জলাশয়ে পড়ে থাকার খবর পড়ি, তারা কারা? তাদের কি কোন স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে? এসব মৃতের মৃত্যুর দায়ভার কার? একটি দেশ সম্বন্ধে যে কারও কী ধারণা জš§াতে পারে, যেখানে বাজারের ব্যাগে খণ্ডিত মস্তক পাওয়া যায়?
এসব অস্বাভাবিক মৃত্যুর কি কোন সঙ্গত ব্যাখ্যা আছে? রাষ্ট্র কি তার নাগরিকদের জন্য তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছে? ক্ষমতাসীনরা অবশ্যই বিচারবহির্ভূত মৃত্যুর পক্ষে নয়। কিš‘ তা যাতে না ঘটতে পারে তার ব্যব¯’া গ্রহণ কি তারা নিশ্চিত করেছে? এসব প্রশ্নবাণে জর্জরিত কর্তৃপক্ষ যতই তারস্বরে তার নির্দোষ থাকার কথা বলুক, তা কি বিশ্বাস বা গ্রহণযোগ্য?
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের গুম, পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু, অকারণে নিয়মবহির্ভূতভাবে সাদা পোশাকধারী ডিবি পুলিশের গ্রেফতার এবং বিচারপূর্ব দীর্ঘ কারাবাসকেও মানবাধিকার লংঘন বলা হয়েছে। এসবের পাশাপাশি তো আরও রয়েছে সর্বজনবিদিত বিচার বিভাগের রাজনীতিকরণ, বাক-স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা ও সাংবাদিক নির্যাতন এবং সর্বগ্রাসী রাজনৈতিক সহিংসতায় মৃত্যু। এ বাস্তবতার মধ্যেই বাঁচতে হয় এ দেশে।
ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ ও সাগর-র“নীর মৃত্যু রহস্য উদঘাটনে সরকারের দুর্বোধ্য ঔদাসীন্য ও ব্যর্থতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক অ্যামনেস্টি। সং¯’াটির মতে, রাজনৈতিক সদি”ছার অভাব ও আইন-শৃংখলা বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহারে বাংলাদেশে মানবাধিকারের দৃশ্যমান কোন উন্নতি নেই। ক্ষমতাসীনরা তাদের ক্ষমতার শেষ বেলায় স্বভাবতই তাদের আখের গোছাতেই ব্যস্ত। এটাই স্বাভাবিক। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটও তাই করেছিল তাদের মেয়াদের অন্তিম সময়ে। মাঝে মাঝে ভাবি, এমনই কদর্য বাস্তবতার মধ্য দিয়েই আমরা ফুরিয়ে যাব। দেশ ও তার ভবিষ্যৎ নিয়ে যতই আশাবাদ পোষণ করি, যতই আশায় বুক বাঁধি এবং উš§ুখ অপেক্ষায় থাকি একটি ইতিবাচক পরিবর্তন দেখব বলেÑ পরক্ষণেই তা ধসে পড়ে হত্যা, গুম, নির্যাতনে এক গুলাগ বা গুয়ানতানামো সদৃশ এ দেশের ভাবমূর্তি গড়ে ওঠা দর্শনে। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের নৃশংসতা নিয়ে কথা বলা যায়, প্রতিবাদ করা যায়। কিš‘ বাংলাদেশের আইন-শৃংখলা বাহিনীর বির“দ্ধে নেতিবাচক বক্তব্য মারাÍক ঝুঁকিপূর্ণ। সে যেন শ্বাপদসংকুল অরণ্যে বাস করে ব্যাঘ্রের লেজে হাত দেয়া। যদিও অনেক অপরাধের সঙ্গেই নাকি তাদের কমপ্লিসিটি একটি ওপেন সিক্রেট। ইদানীং সংবাদপত্রে দেখেছি, তারা নাকি আওয়ামী ক্যাডারদের সঙ্গে মিলেমিশে চাঁদাবাজি করে।
কিš‘ তারা তো এ দেশের বাস্তবতায় সবকিছুই করতে পারে। কেননা, খোদ সরকার টিকে থাকার জন্য এবং সরকারের প্রতিপক্ষকে ঠেঙানোর জন্য তাদের ওপরই নির্ভরশীল। সুতরাং তাদের মধ্যে পারস্পরিক একটা আপস-সমঝোতা থাকাই স্বাভাবিক। কিš‘ কতদিন তারা একটি আন্তর্জাতিক বিরূপ প্রতিক্রিয়া উপেক্ষা করে চলতে পারবেÑ সেটাই আশার কথা, যদিও সে আশা অত্যন্ত ক্ষীণ। কেননা, এখন তো দেশে প্রতিবাদের সুযোগও আর থাকছে না। বিরোধী দলও তার অতীতের সব গ্লানি সর্বাঙ্গে জড়িয়ে নিত্য নতুন মামলায় জর্জরিত। তারা শাসর“দ্ধকর বর্তমান রাজনৈতিক আবহে কতটা সুবাতাসের সঞ্চার করতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
আমরা জানি না, বাংলাদেশের এই মৃত্যুপুরীতে অহরহ লাশের গন্ধের বিকৃত এক বাস্তবতায় কতকাল প্রলম্বিত হবে এ দেশবাসীর বসবাস। শেষ পর্যন্ত কি সব আশা নিভে গেলে আমরা একটি নিñিদ্র অন্ধকারে দীর্ঘ পথের এক কানাগলিতে আটকে যাব, যেখান থেকে নিষ্ক্রমণের কোন পথ নেই? কিš‘ আমরা বিশ্বাস করি যে আমাদের ত্রাণকর্তা একজন আছেন, যিনি শক্তি মদমত্তদের সব কৌশলের জালকে মাকড়সার জালের মতো ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারেন। যিনি তার এক প্রেরিত পুর“ষকে মাছের পেটের অন্ধকার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। সর্বোপরি অনুকূল ও প্রতিকূল অব¯’ার স্রষ্টাও তিনি।
মানুষের ভাগ্যের চালিকাশক্তিও একই উৎসের সৃষ্টি। আমি আইয়ুব-ইয়াহিয়ার প্রায় একই প্রকার শক্তি মদমত্ততা দেখেছি। বিশ্বের বিভিন্ন সময়কার বিভিন্ন স্বে”ছাচারীর একই প্রকার ক্ষমতার খেলা ও বিয়োগান্ত ভাগ্য বরণের ইতিকথা সমসাময়িক ইতিহাসে পড়েছি। আমাদের স্বৈরশাসকদেরও ভাগ্য যে অভিন্নই হবে সে সম্বন্ধে আমি নিশ্চিত। ইতিমধ্যে মানুষের মঙ্গল কামনায় বা অন্যায়ের প্রতিরোধে বা সত্য ভাষণের জন্য যারা শাসকগোষ্ঠীর কোপানলে পড়ে নিখোঁজ, অপহƒত বা অস্বাভাবিক ও অজ্ঞাত মৃত্যুর শিকার হয়েছেন, লাখো মানুষের মানসপটে অংকিত তাদের সমাধিতে আমাদের ‘এপিটাফ’ : আমরা তোমাদের ভালোবেসেছিলাম।
এম আবদুল হাফিজ : নিরাপত্তা বিশ্লেষক

শনিবার, ২৬ মে, ২০১২

রেটোরিক কেউ পছন্দ করে না


এম আবদুল হাফিজ
রাজনীতিতে রেটোরিক বা বাগাড়ম্বর ক্ষমতাসীনদেরই বিশেষ অধিকার। তারা পদাধিকারবলে আরও অনেক সুবিধা ভোগ করেন, যাতে বিরোধীদলীয়দের অংশীদারিত্ব নেই। ক্ষমতাসীনদের আচরণ-উচ্চারণ নিয়ে কদাচিৎ কেউ কোনো প্রশ্ন তোলে। রাজনীতির দ্বন্দ্বে ঐতিহ্যগতভাবেই বিরোধী দল দুর্বল পক্ষ এবং সেভাবেই তা তাদের চেতনায় রেখে রাজনীতি পরিচালিত হয়। বিগত নির্বাচনে পরাজয়ের প্রচণ্ড ধাক্কা সামলে ওঠার অব্যবহিত পরই রাজনীতির অঙ্গনে দলটি সরব হয়ে ওঠে এবং মূল মঞ্চে তার উত্তরণ ঘটে। সংসদে মাত্র ক'জন সদস্য নিয়ে কী করতে পারবে তার হিসাব-নিকাশ করেই বিএনপি রাজপথেই অধিক সক্রিয় হতে চেষ্টা করে।
একথা স্বীকার করতেই হবে যে, বিগত সাড়ে তিন বছরের আওয়ামী শাসনামলে অন্তত রাজপথে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট তাদের ভিত পাকা করে ফেলেছে। জোটনেত্রী খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা তো ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী সমর্থক ঝড়েও অক্ষত ছিল। সংসদে না হলেও দেশের জনগোষ্ঠীর মধ্যে দলটি সমর্থনের সমতা রক্ষা করতে পেরেছিল। এ সত্ত্বেও বিএনপির বিগত মেয়াদের রেকর্ড ভালো ছিল না। তবু শুধু আওয়ামীদের অকল্পনীয় দুঃশাসনের কারণে বিএনপি তার হাতছাড়া রাজনৈতিক পরিসরের অনেকটাই পুনর্দখলে সমর্থ হয়।
বিএনপি তার সত্বর পুনরুত্থানে দুঃসাহসিক হয়ে কিছু ভুল পদক্ষেপে প্রবৃত্ত হয়। দলটি কিছু বাগাড়ম্বর ও আলটিমেটামের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে, যা রাজনীতিতে এমনকি ক্ষমতাসীনদের জন্যও ভালো নয়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তথা মহাজোটকে তা মানালেও এবং তারা সে ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা রাখলেও বিরোধী দলের জন্য এ পর্যায়ে তা মোটেই যৌক্তিক নয়। স্মরণ করা যেতে পারে, আওয়ামী লীগ একইভাবে বিএনপির শাসনামলে সরকার পতনের আলটিমেটাম দিয়েছিল এবং নির্বুদ্ধিতা ও শূন্যগর্ভ আস্ফালনের জন্য আওয়ামী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল জলিল হাস্যাস্পদ হয়েছিলেন।
রাজনীতিকদের মধ্যে বড় বড় বুলি আওড়ানোর প্রবণতা থাকে। তাছাড়া নিজেদের বড়ত্ব এবং শক্তি জাহির করার একটি প্রচ্ছন্ন ঝোঁক প্রায় সময়ই অনভিপ্রেত পরিণতিতে পেঁৗছায়। বিএনপির সামান্য ক'জন নেতা যারা এখনও কারামুক্ত তাদের প্ররোচণামূলক ভাষণ ও আচরণ সরকারকে ক্ষেপিয়ে তুলছে এবং দলকে অনিশ্চিত অবস্থার মুখোমুখি করছে।
১০ জুনের আলটিমেটামসহ বিএনপির অযাচিত হুংকার_ প্রয়োজনে তারা একদফার আন্দোলন তথা সরকার পতনের আন্দোলনের সূচনা করবে। অথচ বিএনপি জানে, নির্বাচিত একটি সরকারের পতন হয় না। যেমন দুর্ধর্ষ আন্দোলনকারী আওয়ামী লীগও তাদের একই প্রকার হুংকার সত্ত্বেও বিগত মেয়াদের বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারকে উৎখাত করতে সমর্থ হয়নি। নির্বাচিত কোনো সরকারের মেয়াদ পূর্তির আগে পতন হওয়া উচিতও নয়। তেমনটি হলে সত্যিকার অর্থেই রাষ্ট্র নৈরাজ্যে নিপতিত হয়। তাই সব দলেরই রাজনীতিতে সংযম ও ধৈর্যের প্রয়োজন। ক্ষমতাসীন সরকার নির্বাচনের প্রাক্কালে এমনই বাড়াবাড়ি করে থাকে_ হার্ডলাইনে যায়, যদিও আখেরে কোনো লাভ হয় না। জনগণ একবার বিরূপ হলে তার প্রকাশ চলমান ঘটনাপ্রবাহে কোনো না কোনোভাবে প্রতিফলিত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট নির্বাচনে আওয়ামীদের ওয়াশ আউটে জনরোষ এবং বিরাগের ক্ষুদ্র স্ফুলিঙ্গ পরিলক্ষিত হলো। এর জন্য কোনো আলটিমেটামের দরকার হয়নি। তবে সরকারের যে কোনো দুরভিসন্ধি বাস্তবায়নের পথে অহিংস কার্যক্রম নেওয়া যেতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, সরকারের মহামারীসদৃশ দুর্নীতি ও অনিয়ম সম্পর্কে জনগণকে সচেতন রাখা। হুমকি-ধমকি, শাসানো রাজনীতির কোনো গ্রহণযোগ্য নীতি নয়। এমনিতেই এমনকি অর্থমন্ত্রী স্বীকৃত সর্বব্যাপী দুর্নীতির প্রসার যে দুর্গন্ধ ছড়িয়েছে সুরঞ্জিত বাবুদের বদৌলতে তা এখন সর্বজনবিদিত। দুর্নীতির একটি কুকীর্তি ঢাকতে গেলে আরেকটি বেরিয়ে পড়ছে। সংবাদপত্রে প্রতিবেদন অনুযায়ী এখন নাকি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন আওয়ামী ক্যাডারদের সঙ্গে মিলেমিশে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করে। ভোগবাদে আসক্ত আওয়ামী পরিবারের অন্তর্ভুক্ত নব্য ধনীদের চাহিদার অন্ত নেই। যাদের একটি ফ্ল্যাট আছে তারা আরও চায়, যাতে পরিবারের প্রতিটি সদস্য স্বতন্ত্রভাবে থাকতে পারে।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, আওয়ামী ফন্দি ও চাতুর্য তাদের গলার ফাঁস হবে এবং বিএনপি তার স্বাভাবিক উত্থানের ধারা ধরে রাখতে পারবে। কিন্তু তাদের রেটোরিক লোকে পছন্দ করবে না, বিশেষ করে সরকার পতনের হুংকার। জনগণ একটি ক্ষমতাসীন দলকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ম্যান্ডেট দেয়। সে সময় উপনীত হওয়ার আগে তাদের টেনে নামানোর চেষ্টা জনগণের রায়ের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শনেরই শামিল।

ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম আবদুল হাফিজ : সাবেক মহাপরিচালক বিআইআইএসএস ও কলাম লেখক