শনিবার, ৩০ জুন, ২০১২

নিজের সঙ্গেই যুদ্ধে লিপ্ত


 এম আবদুল হাফিজ
পশ্চাৎপদ দেশগুলোতে অথর্ব সরকারগুলোর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসই উসকে দেয় এমন যুদ্ধকে। তারা এমনও ভাবে যে, প্রতিপক্ষকে এক হাত দেখিয়ে দিতে পেরেছে সরকার। কিন্তু সত্বরই তাদের এই আত্মপ্রসাদ উবে যায় যখন তারা দেখে যে ওই সন্ত্রাসের আগুন গণরোষানলের সঙ্গে একাকার হয়ে তাদের নিভৃত নিরাপদ বাসকেও গ্রাস করতে চলেছে। বিএনপির অপশাসন, অপকৌশল এবং স্ব-আরোপিত শাস্তি নিয়ে এন্তার লেখা হয়েছে, যদিও সেসব থেকে দলটি বিন্দুমাত্র শিক্ষা নেয়নি। একই পথে হাঁটছে আরেক দাম্ভিক নেতৃত্বের অধীন ঐতিহ্যবাহী আওয়ামী লীগ, যার গণবিরোধী সব নীতি ও পদক্ষেপকে মনে হবে যেন দলটি দেশ ও দেশবাসীর বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, যা প্রকারান্তরে জাতির নিজের সঙ্গে নিজেরই যুদ্ধের শামিল। আওয়ামী লীগ প্রতিশ্রুতির মধ্য দিয়ে বিশাল ম্যান্ডেট নিয়ে ২০০৮ সালের প্রদোষলগ্নে ক্ষমতার দুর্গে প্রবেশ করেছিল। অতঃপর প্রধানমন্ত্রীসহ আওয়ামী সরকারের সিংহভাগ মন্ত্রী-আমলার অনেক স্বপ্ন-সাধ পূর্ণ হয়েছে। রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে অনেকেই কোটিপতি হয়েছেন, যদিও নিন্দুকরা বলে যে কোটি টাকা তো মন্ত্রীর একজন পিএস/এপিএসও রোজগার করে বা ফেনসিডিল-ইয়াবা ফেরি করেও রোজগার হয়। মন্ত্রী-আমলাদের রোজগারের ওই ছকে ফেলা যায় না, সেটি তাদের জন্য মর্যাদাহানিকর।
কথা তো ছিল একটি দারিদ্র্যমুক্ত-বৈষম্যহীন সমাজ নির্মাণের। প্রধানমন্ত্রীসহ দেশের একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তিও সভা-সেমিনার-টক শোতে বিভিন্ন খাতে অগ্রগতির কথা বলেন। আরও বলেন, আর্থ-সামাজিক অনেক সূচকের ঊর্ধ্বগামিতার কথা। আমারও ওইসব শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু সমস্যা যে বাস্তবে তার কোনোটাই খুঁজে পাই না।
পবিত্র রমজান মাসের প্রাক্কালে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারি পদক্ষেপগুলোর দীর্ঘ খতিয়ান সংবাদপত্রে আসতে শুরু করেছে। বিগত বছরগুলোতেও তা আসত, কিন্তু কখনোই আমরা বাজারে তার প্রভাব ঘটতে দেখিনি। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের ভেতর দিয়ে একই রকম মহার্ঘতার বোঝা ঘাড়ে চাপিয়েই আমাদের পবিত্র মাসটি অতিক্রান্ত হতো। এই চিত্র সমাজের ও দেশের সব ক্ষেত্রেই। কৃচ্ছ্র সাধনের নামে পবিত্র ঈদেও সন্তান-সন্ততির সঙ্গে প্রতারণা ও বঞ্চনার খেলা খেলতে হয়েছে সীমাবদ্ধ আয়ের মানুষকে।
বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভাজিত এ দেশে কর্তৃপক্ষ প্রকারান্তরে জনগণকে বুঝিয়েই দেয় যে_ ঈদ, ইফতার পার্টিসহ রমজান এবং এহেন অনুষ্ঠান উদযাপন মূলত এলিট শ্রেণীর, যাদের ট্যাঁকে আছে ছিনতাই-মুক্তিপণের, উৎকোচ-টেন্ডার বাণিজ্যের বা হাজারো কিসিমের অসদুপায়ে অর্জিত অগুনতি টাকা। এমন বিভাজন ও বিভক্তির একটি জাতি বড়জোর নিজেদের মধ্যেই উচ্ছিষ্ট নিয়ে কলহ করতে পারে, কিন্তু বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে কোনো দুর্ভেদ্য প্রাকার গড়ে তুলতে পারে না। তার জন্য চাই ইস্পাত ঐক্যের একটি জাতি, যার জীবন-দর্শন অভিন্ন এবং কট্টর সমাজতান্ত্রিক সাম্য না থাকলেও যাদের মধ্যে থাকবে আর্থ-সামাজিক সমতা। সেই অবস্থায় আর নেই এই জাতি। গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতাসহ সমাজতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এদেশ অস্তিত্বে এলেও, ছেঁড়া ন্যাকড়ার মতো ছুড়ে ফেলা হয়েছে সমাজতন্ত্রের মহান আদর্শকে এবং তার সঙ্গে উদ্ভব ঘটেছে নব্য ধনিক, নব্য রক্ষণশীলদের। তারা রাষ্ট্রের শেষ সম্বলটুকুও হস্তগত করতে ক্ষমতাসীন বনাম ক্ষমতাসীন দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। অভিবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ এবং আমাদের সুদক্ষ পোশাক শিল্পীদের শোষণ করে বা তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করে এ নব্য ধনিকরা নির্লজ্জ ভোগবাদ ও কনজ্যুমারিজমে লিপ্ত হয়। এই অস্থিতিশীল বিশৃঙ্খল দেশে তারা নিজেরাই তাদের উপার্জিত অর্থ বিনিয়োগ করতে চায় না। এও এক প্রকার যুদ্ধ, যা দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়।
জাতি নিজের সঙ্গে নিজেই যুদ্ধে লিপ্ত। কিন্তু জাতি তা উপলব্ধি করতে অক্ষম। জনগণ একটি ঘোরের মধ্যে বাস করছে। স্রেফ টিকে থাকার লড়াইয়ে মানুষ নিরন্তর ছুটছে। তার মহৎ কল্যাণকর বা অধিবিদ্যামূলক কিছু ভাবার অবকাশ নেই, যদিও এই প্রচণ্ড গতির যুদ্ধে সে নিজেই বারবার পরাজিত হচ্ছে। দেশ, সমাজ, রাজনীতি নিয়মের নিগড় ভেঙে যে চলার পথ বেছে নিয়েছে, নিয়মের অভাবেই তা তার সাবলীলতাকে ধ্বংস করে তার সৃজনশক্তিকে বাধাগ্রস্ত করবে।
এখনও এ দেশের ভাণ্ডারে যা আছে বা যা উৎপাদিত হতে পারে, যদি নব্য ধনতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণহীন বিকাশের লাগামকে টেনে ধরতে পারি, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শৃঙ্খলাকে ফিরিয়ে আনতে পারি এবং দেশটাকে প্রাণভরে ভালোবাসতে পারি তাহলে সম্ভাবনার সীমা নভোমণ্ডলকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। ঞযবহ ংশু রিষষ নব ড়ঁৎ ড়হষু ষরসরঃ.


ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম আবদুল হাফিজ : সাবেক মহাপরিচালক বিআইআইএসএস ও কলাম লেখক

শনিবার, ২৩ জুন, ২০১২

পারস্পরিক অপরিহার্যতাই পাক মার্কিন মৈত্রীর নেপথ্য শক্তি




এম আবদুল হাফিজ
২০১১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের তৎকালীন চেয়ারম্যান অ্যাডমিরাল মাইক মুলেন ওই পদে থাকা অব¯’ায় শেষবারের মতো সিনেট আর্মড ফোর্সেস কমিটির মুখোমুখি হন। সেখানে তার বক্তব্যে তিনি অশিষ্টভাবে পাকিস্তানের সমালোচনা করেন। তিনি কমিটিকে স্পষ্টই বলেন, উগ্রবাদী ধর্মীয় সংগঠনগুলো কার্যত সেখানকার সরকারের হয়েই আফগান সৈন্য এবং বেসামরিক লোকজনসহ মার্কিন সৈন্যদের ওপরও হামলা চালিয়ে যা”েছ। হাক্কানি নেটওয়ার্ক সম্বন্ধে তিনি বলেন, ওটি আসলে গোয়েন্দা সং¯’া আইএসআইরই একটি কৌশলগত শাখা। মুলেন প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী এ নেটওয়ার্ক ২০১১ সালের জুন মাসে কাবুলের ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে আক্রমণ চালায়। অতঃপর বছরের সেপ্টেম্বরে ওয়ার্দাক প্রদেশে ট্রাক-বোমার হামলা এবং সে মাসেই কাবুলে মার্কিন দূতাবাসে সন্ত্রাসী হামলা চালায়। 
এত কিছু বলার পরও মুলেন প্রত্যাশিত উপসংহারে আসেননি। পাকিস্তানের বির“দ্ধে এমন একগাদা অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও মুলেন একথা বলা থেকে বিরত থাকেন যে, ‘পাকিস্তানকে একটি বৈরী শক্তি হিসেবে শনাক্ত করা হোক’। বরং মুলেনের সাক্ষ্য-প্রমাণের ক’দিন পর আবার আগের মতো পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই তাদের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে তথাকথিত সহযোগিতা বা তার ভান করতে স্ব স্ব ভূমিকায় ফিরে যায়। অর্থাৎ কেউ কাউকে বিশ্বাস না করেও আগের মতো পরস্পরের ‘সহযোগিতা’ করতে থাকে। এর কারণ যুক্তরাষ্ট্র জানে, পাকিস্তান ছাড়া তাদের গত্যন্তর নেই। যেমন পাকিস্তানও জানে যে, যতই অপ্রিয় হোক মার্কিন সাহায্য ছাড়া তারা অচল। 
যুগ যুগ ধরে মার্কিনিরা পাকিস্তানি সাহায্যকে খরিদ করেছে। শুধু এক-এগারোর পরই পাকিস্তানকে প্রদত্ত মার্কিন সাহায্যের পরিমাণ ২০ বিলিয়ন ডলার। এটাই শুধু পাকিস্তানি সহযোগিতার মূল্য নয়, সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে অজস্র প্রশংসায় ধন্য করেছে। ২০০৭ সালে মুলেন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফে নিয়োগ পাওয়ার পর ইসলামাবাদে তার প্রথম সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানকে ‘অটল ঐতিহাসিক মিত্র’ বলে অভিহিত করেছিলেন। ২০০৮ সালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিৎসা রাইস পাকিস্তান সম্বন্ধে বলেছিলেন, ‘এটি এমন একটি দেশ যা সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত হওয়া তো দূরের কথা, বরং যেখানেই সন্ত্রাসের গন্ধ পাওয়া যায়, সেখানেই এই দানবের বির“দ্ধে লড়ে আসছে। 
ইত্যবসরে মার্কিন নেতৃত্ব পাকিস্তানি নেতৃত্বের সঙ্গে মিথষ্ক্রিয়ায় অনানুপাতিক সময়ও ব্যয় করেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে হিলারি ক্লিনটন ভারতে দু’বারের বিপরীতে চারবার পাকিস্তান সফর করেছেন। অ্যাডমিরাল মুলেন বিশ বিশবার পাকিস্তানে এসেছেন। এতদসত্ত্বেও পাকিস্তানের বির“দ্ধে কুৎসায় মুলেনই প্রথম ব্যক্তি নন এবং তিনি ওই ভূমিকায় সর্বশেষও হবেন না। ২০০৮ সালে সিআইএ কাবুলে ভারতীয় দূতাবাসে বোমা হামলার জন্য পাকিস্তানকে দেষী করেছিল। ২০১১ সালে এবোটাবাদে ওসামা বিন লাদেনের আস্তানায় নেভি সিলস কমান্ডোদের হামলার মাত্র দু’মাস পর অ্যাডমিরাল জেম্স্ উইন ফিল্ড জয়েন্ট চিফসের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে সিনেটের আর্মড ফোর্সেস কমিটিতে সাক্ষ্য দানকালে পাকিস্তানকে অত্যন্ত জটিল পার্টনার বা সহযোগী বলেছিলেন। ওই বছরেই হিলারি ক্লিনটন এক সংবাদ সম্মেলনে আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের উপ¯ি’তিতে বলেছিলেন, ওবামা প্রশাসন পাকিস্তানিদের জোর-ধাক্কা দিয়ে সহযোগিতায় সক্রিয় করতে চেয়েছিল। তাই তা ফল বয়ে আনুক বা না আনুক, ওয়াশিংটনের পাকিস্তানকে সমালোচনা এবং সঙ্গে কিছু সাহায্যের থলি আসলে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের কৌশলের অংশ, কিš‘ সে কৌশল সামান্যই সফল হয়েছে। ভয়ভীতি প্রদর্শন বা সমালোচনায় পাকিস্তানে কোন কাজ হয় না, কারণ ইসলামাবাদের নেতারা ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে। কেননা যুক্তরাষ্ট্রই যে পাকিস্তানকে ভয় করে, এর কিছু ঘটনা অজ্ঞাত থাকেনি। মার্কিনিদের বিশ্বাস, পাকিস্তানি নীতি সাহায্যকারী না হলেও তা আরও খারাপ হতে পারত। ওয়াশিংটন এক রকম ধরেই নিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে সঙ্গে না রাখলে এবং ইসলামাবাদ আফগানিস্তানে সব সহযোগিতা বন্ধ করে দিলে সেটা হবে মার্কিনিদের সন্ত্রাস প্রতিরোধ যুদ্ধের সমাপ্তি। 
আরও সমস্যা যেÑ যেমনটা চলমান ভাবনায় প্রকাশ পায়Ñ বাইরের কোন সাহায্য-সমর্থন ব্যতিরেকে রাষ্ট্র হিসেবে নড়বড়ে পাকিস্তানের ভেঙে পড়ার আশংকা। এমন অব¯’ার উদ্ভব হলে ইসলামাবাদে একটি উগ্রবাদী শাসনের আশংকা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তা যদি হয়, স্বভাবতই সেক্ষেত্রে পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্র মৈত্রী তো দূরের কথা, উভয়ের মধ্যে ক্ষীণতম সংযোগের সুযোগও হয়তো থাকবে না। আফগানিস্তানে মার্কিন সমর্থনপুষ্ট কারজাই সরকারের সঙ্গেও হয়তো পাকিস্তানের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। ফলে সমগ্র অঞ্চলে অ¯ি’রতা ছড়িয়ে পড়বে। এমন অব¯’া এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কায়েমি স্বার্থকে ক্ষুণœ করবে। শুধু তাই নয়, ইসলামাবাদকে উগ্রবাদীদের হাতে পড়তে দিলে এমনকি একটি পারমাণবিক যুদ্ধ অন্তত ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সংঘটিত হতে পারে। 
পাকিস্তান-মার্কিন মৈত্রী সমস্যা সংকুল হলেও এর অর্জনও কিš‘ একেবারে নগণ্য নয়। এতদিন ধরে পাকিস্তানই তো মার্কিন সৈন্যদের জন্য রসদ সামগ্রী পাকিস্তানি ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে সরবরাহের সুযোগ দিয়েছে। এখন ন্যাটো না হয় মধ্য এশিয়া ও র“শ বদন্যতায় বিকল্প সরবরাহের পথ খুঁজে পেয়েছে। কিš‘ নয়-এগারোর প্রথম প্রহরে পাকিস্তানই ঝুঁকি নিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের অনুকূলে সরবরাহ পথ দেয়া ছাড়াও অনেক মূল্যবান ভূমিকা রেখেছে। অনেক শীর্ষ আল কায়দা নেতাকে পাকড়াও করে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ মার্কিনিদের হাতে তুলে দিয়েছে। নয়-এগারোর একজন পরিকল্পক খালিদ শেখ মুহম্মদকে পাকড়াও করতে পাকিস্তানের অবদান আছে। এছাড়া আফগানিস্তানে ড্রোন হামলার সূত্রপাতই হয়েছিল বেলুচিস্তানে পাকিস্তান প্রদত্ত ঘাঁটি থেকে। 
তবু পাকিস্তানে মার্কিন সাহায্যের সব অবদানই ম্লান হয়ে যায়, যখন অনেক বিষয়েই পাকিস্তানের জেদি অসহযোগিতা বিবেচনায় আনা হয়। ইতিমধ্যেই পাকিস্তানের দুর্নাম হয়েছে বিশ্বে সর্বাপেক্ষা মারাÍক পরমাণু বিস্তারের হোতা হিসেবে। পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ তথাকথিত এ কিউ খান নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইরান, লিবিয়া ও উত্তর কোরিয়ায় অর্থের বিনিময়ে পারমাণবিক প্রযুক্তি পাচার করেছে বলে অভিযোগ আছে। 
পাকিস্তান আল কায়দা, তালেবান ইত্যাদি জঙ্গিগোষ্ঠীর বির“দ্ধাচারণ করলেও হাক্কানি নেটওয়ার্কসহ আফগান-তালেবান এবং হিজবে ইসলামীর মতো জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে প্রকাশ্যে না হলেও সমর্থন করে। কারণ তাদের দিয়ে ভারতকে এবং কোয়ালিশন সেনাদেরও সন্ত্রাসী চাপে রাখা যায়। অনেক পাকিস্তানি কর্মকর্তা আবার ড্রোন হামলাকে উৎসাহিতও করে। তবে একাধিক কারণে বিন লাদেন হত্যা এবং পাকিস্তানি সার্বভৌমত্ব লংঘন করে মার্কিন কমান্ডোদের হেলিকপ্টারে পাকিস্তানে প্রবেশের ঘটনায় পাকিস্তানিরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে, যার জের এখনও চলছে। সিআইএ’র চর রেমন্ড লাহোরে দুই পাকিস্তানিকে হত্যা করা সত্ত্বেও তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেরণকে ঘিরে পাকিস্তানিদের মধ্যে অনেক অসন্তোষ আছে। সর্বোপরি পাকিস্তানেরই অংশ উপজাতীয় অঞ্চলে নির্বিচার মার্কিন ড্রোন হামলা এবং তাতে বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যু পাকিস্তানে এক প্রচণ্ড মার্কিনবিরোধী অনুভূতি সৃষ্টি করেছে, যা অব্যাহত আছে। 
তা সত্ত্বেও সব দিক বিচার করে পাক-মার্কিন মৈত্রী টিকে থাকবে। সেই পঞ্চাশের দশক থেকে পাকিস্তান যখন প্রথম আঙ্কল স্যামের আলিঙ্গনে ধরা দিয়েছিল, সেই থেকেই পাক-মার্কিন সম্পর্কে অনেক চড়াই-উৎরাই এসেছে এবং সেসব মোকাবেলা করেই আজও দু’দেশের মৈত্রী অনেক বিতর্কিত হয়েও টিকে আছে। এবং এই দীর্ঘদিনে উভয় দেশই পরস্পরের প্রতি এতটাই আসক্ত যে, যতই নড়বড়ে হোক একটি মৈত্রী বন্ধন পরস্পরের স্বার্থেই টিকে থাকবে। সন্ত্রাস মোকাবেলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পাকিস্তানি ভূখণ্ড ও সামরিক বাহিনী যেমন প্রয়োজন, তেমনি লুটেপুটে খাওয়া এক কংকালসার পাকিস্তানের অস্তিত্বের জন্য একইভাবে দরকার মার্কিন সাহায্য ।
এম আবদুল হাফিজ : নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

প্রবাদের উটের পৃষ্ঠে সর্বশেষ খড়কুটো


 এম আবদুল হাফিজ
প্রবাদের উটের পৃষ্ঠে সর্বশেষ খড়কুটো চাপানোর বোঝা আমরা এ দেশের সাধারণ মানুষ আমাদের পৃষ্ঠেই ধারণ করে ছেচড়িয়ে ছেচড়িয়ে সামনে এগোচ্ছি যে কোনো মুহূর্তে থুবড়ে পড়ার শঙ্কা নিয়ে। দৈনন্দিন খরচ মেটাতে গত এক বছরে মানুষের ব্যয় বেড়েছে ৫০ শতাংশের অধিক, যার বিপরীতে আয় বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র ১৮ শতাংশ। নিরুপায় মধ্য ও নিম্নবিত্তরা ব্যয় সংকোচন করে এবং প্রয়োজনের অনেক কিছু বর্জন করেও আয় ও ব্যয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে পারছেন না। হিড়িক পড়েছে পেনশনভোগী ও নিম্নবিত্তদের মধ্যে সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর। ব্যয় সংকোচন করতে তারা মারাত্মক ব্যাধি না হলে চিকিৎসায়ও বিমুখ। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের প্রদত্ত পূর্বাভাসে বোঝা যায় যে, এত কিছু করে আগামীর জীবনেও কোনো সুদিনের সুখবর নেই। বরং ক্রমবর্ধমানভাবেই এই মহার্ঘতা দানবীয় রূপ ধারণ করছে। তা নিত্যপণ্যের মূল্যেই হোক, বাড়ি ভাড়ায়ই হোক, যানবাহনের ভাড়ায়ই হোক, লেখাপড়ার বা চিকিৎসার খরচেই হোক_ সর্বত্র একই অবস্থা, একই ভীতি, একই নৈরাশ্য। এমনই এক প্রেক্ষিতের বিপরীতে আমাদের রস-রসিকতায় টইটম্বুর এককালের স্বৈরশাসক এরশাদেরও অর্থমন্ত্রী সম্ভবত ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের এই মেয়াদের শেষ বাজেটটি পেশ করেছেন। অকপটে স্বীকার করে নিচ্ছি যে, বাজেট-পাটিগণিতের মারপ্যাঁচ কদাচিৎ আমার বোধগম্য। ওইগুলো বোঝার জন্য আছে সিপিডি, বিআইডিএস, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের অর্থনীতিবিদরা। তাদের এক্সপার্ট মতামত এবং কোথাও নেই কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক অঙ্গনে লব্ধপ্রতিষ্ঠ এমন বিশেষজ্ঞদের মত ও মন্তব্য এখনও অব্যাহত আছে। তাদের প্রায়ই সাংঘর্ষিক মতামতে আরও বিভ্রান্ত হতে হয়। আমার মতো ছাপোষা সাধারণ মানুষ আগ্রহ ভরে দেখে যে, অন্তত আগামী এক বছর জীবনটা কীভাবে এবং কেমন কাটবে।
প্রস্তাবিত বাজেটের আলোকে সেখানেও আমাদের মতো অর্থনীতিবিদ মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম থেকে সিপিডির ফেলো দেবপ্রিয়র মতানুযায়ী সামনে মুদ্রাস্ফীতি কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। তার মতে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের চাপে জ্বালানির দাম বাড়ানো হলে মুদ্রাস্ফীতিতে খুবই প্রভাব পড়বে। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য কমেছে। তা সত্ত্বেও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, যাতে নিত্যপণ্যসহ পরিবহন ইত্যাদি সবকিছুর খরচ ঊর্ধ্বমুখী হবে_ যৌক্তিক নয়। তা ছাড়া বছর বছর বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করে রেকর্ড গড়েছে মহাজোট সরকার। ক্ষমতা গ্রহণের পর মহাজোট সরকার পাইকারি বিদ্যুতের দাম পাঁচবার ও খুচরা বিদ্যুতের দাম চারবার বৃদ্ধি করেছে। এরপরও কখন, কোন সেবা খাতের মূল্য কতটা বাড়বে তারও গুঞ্জন রয়েছে। কার্যত সর্বক্ষণ আমাদের গর্দানের ওপর অস্বস্তিকরভাবে ঝুলে আছে ডেমাক্লিসের তলোয়ার।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমাদের মতো চালচুলোহীন মানুষকে সুখস্বপ্ন দেখান যে, আমরা ২০২০ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হলেই আমাদের আয় ও ব্যয়ের বৈষম্য দূর হবে। হয়তোবা হবে। কিন্তু তাই বলে তো সামাজিক বৈষম্য ফুৎকারে উবে যাবে না। সেটি তো একটি কাঠামোগত বা শ্রেণী বিভাগভিত্তিক বাস্তবতা। তাই সম্ভবত তেমন আয়ের দেশেও বিভক্তি একটি থেকেই যাবে। তাই আমজনতার জন্য অন্ধকার হয়তো ঘুচবে না, তাদের দুর্দিনের অবসানও ঘটবে না। অন্তত এবারে বাজেটে তার কোনো সংকেত নেই। মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সোপান প্রবৃদ্ধি। জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তা অর্জনের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট প্রায় সবাই সন্দিহান। করারোপের পরিধি সম্প্রসারণে যাদের করের আওতায় আনা হয়েছে তার অন্তর্ভুক্ত কেউই কর প্রদানে সক্ষম নন।
বাজেট আসে বাজেট যায়_ আমাদের ভাগ্যের কোনো ইতিবাচক পরিণতি নেই। যেই যেখানে ছিলাম, সেখানেই আছি। অথবা আগের অবস্থান থেকেও পেছনে ছিটকে পড়েছি। জঠরের দাবি, পরিবারের যৎসামান্য শখ-আহ্লাদ বা নিজের মান-সম্ভ্রম_ এগুলোর মধ্যে একটি ভারসাম্য বহাল রাখতেই সার্বক্ষণিক যুদ্ধ। টানাপড়েনের জীবনে অনেক অজানা বিষয় থাকে, যা কারও সঙ্গে শেয়ার করা যায় না। শুধু এক বোবা অনুভূতির শিরা বেয়ে নিরন্তর রক্তক্ষরণ হতে থাকে।
মধ্য আয়ের বা নিম্ন আয়ের দেশের সিংহভাগ মানুষের আয়ে কোনো প্রবৃদ্ধি নেই। তারা বাজেটে বর্ণিত ছয়, সাত বা দশ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতেও নিশ্চল, প্রতিক্রিয়াহীন। কেননা তাতে তাদের কী এসে যায়। কার্যত এসবই বিত্তবানদের বিষয়, যাদের আয়-ব্যয়ে বাজেট প্রভাব বিস্তার করে। হায় রে 'মধ্যম আয়ের দেশ', আমাদের কল্পনায় তা ধরাও যায় না, ছোঁয়াও যায় না। ছোঁয়ার কখনও কোনো স্পৃহাও হয় না!

ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম আবদুল হাফিজ :সাবেক মহাপরিচালক বিআইআইএসএস ও কলাম লেখক

মঙ্গলবার, ১৯ জুন, ২০১২

মিসরে রাজনীতি এবং সামরিক বাহিনী

মিসরে রাজনীতি এবং সামরিক বাহিনী



॥ এম. আবদুল হাফিজ ॥

দেশে স্থিতিশীলতা আনয়নের একটি ঘোষিত লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের পদত্যাগের পর গণতন্ত্রের পথ সুগম করতে এবং একটি বেসামরিক সরকারের কাক্সিত অধিষ্ঠানের লক্ষ্যে মিসরের হাইয়ার মিলিটারি কাউন্সিল ২০১১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতা গ্রহণ করে। মিসরে বিক্ষোভকান্ত জনগণ সম্ভাব্য নৈরাজ্য এড়াতে তাদের ভূমিকাকে স্বাগত জানায়। তা ছাড়া আর্মি এমন কোনো আভাসও প্রদর্শন করেনি যে, তারা রাজনৈতিক দৃশ্যপট নিয়ন্ত্রণে আগ্রহী। এর চেয়ে কোনো ভালো বিকল্প না থাকায় মিলিটারি অনিচ্ছা সত্ত্বেও অন্তর্বর্তীকালের জন্য সর্বসম্মতিক্রমে শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা পুনর্বহালের দায়িত্ব নেয়। অনেক সময় অনেক স্থানেই অচলাবস্থা বা দেশ কোনো বিপদের মুখোমুখি হলে মিলিটারি সেই জট ভাঙতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় নেমেছে। এখন কি সেই একই মিলিটারি কোনো বেসামরিক ব্যক্তিত্বের প্রেসিডেন্সি পদাধিকারের বিরোধী? এর সর্বোত্তম উত্তর : অনেক কিছুর ওপর তা নির্ভরশীল।
মিসরের নেতৃস্থানীয়রা অনেক কিছুতেই মতভেদ পোষণ করে থাকেন। কিন্তু যে একটি বিষয়ে তাদের মতৈক্য রয়েছে তা হলোÑ মিসরকে আরব বিশ্বে অবশ্যই একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকায় থাকতে হবে। ১৯৫২ সালে কর্নেল গামাল আবদেল নাসেরের সামরিক অভ্যুত্থান এবং তার বিপ্লবী কমান্ড কাউন্সিলের একটি র‌্যাডিক্যাল জাতীয়তাবাদী পূর্বাভিমুখীনতা (Orientation) কোটি কোটি আরবকে আকর্ষণ করেছিল এবং সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া, সুদান ও ইয়েমেনে পরবর্তীকালে অভ্যুত্থানের মডেল হিসেবে কাজ করেছিল।
সেই সময় থেকেই মিসরের অভ্যন্তরীণ বা বৈদেশিক নীতিতে আমূল পরিবর্তন হলেও যা নাসেরের সময় থেকেই অপরিবর্তিত থেকে যায়, তা হলোÑ দেশটি সব সময়েই একজন সামরিক প্রেক্ষাপটের প্রেসিডেন্ট দ্বারা শাসিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, সেই প্রেসিডেন্ট আবার সশস্ত্র বাহিনীর ওপর নির্ভর করেছেন তার সমর্থনের, গ্রহণযোগ্যতার ও বৈধতার জন্য। জাতীয় জীবনের সন্ধিক্ষণসমূহে মিলিটারির কর্তৃত্ববাদী নিয়ন্ত্রণ সরকারের টিকে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণিত হয়েছে।
১৯৫২ সালে মিসরে মিলিটারি ক্ষমতা গ্রহণের পর রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করা হয়। সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে থাকে বিপ্লবী কমান্ড কাউন্সিল। সামরিক কর্মকর্তারাই প্রধান সরকারি পদগুলো অলঙ্কৃত করেন। তারাই হয়ে পড়েন দেশের কৌশলগত সংখ্যালঘিষ্ঠ গোষ্ঠী, যার অন্তর্ভুক্ত হন প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। তাদের মধ্য থেকেই নিযুক্ত হন সেনাপ্রধান, জাতীয় নিরাপত্তা প্রধান, ক্ষমতাসীন দলের প্রধান, এমনকি বিচার বিভাগের চেয়ারম্যান। এক কথায়, এতে উদ্ভব ঘটে একপ্রকারের প্রেসিডেন্টসিয়াল রাজতন্ত্র। এটি মিলিটারি বোনাপার্টিজমের মিসরীয় সংস্করণ। মজার কথা, সামরিক নেতৃত্ব কোনো জবাবদিহিতায় বিশ্বাস করে না বা গ্রহণ করে না। তাদের ওপর নেই কোনো বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ।
১৯৬৭ সালে ছ’দিনের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে মিসরের শোচনীয় পরাজয় ছিল মিলিটারির রাজনৈতিক ভূমিকায় একটি টার্নিং পয়েন্ট। খোদ মিলিটারির জবাবদিহিতা নিয়ে উচ্চকণ্ঠ স্লোগান উত্থিত হয়েছিল। তখন মিসরের যে জনগণকে ওই অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীর প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, তারা দ্রুত উপলব্ধি করল যে, তারা নেতৃত্বের অমার্জনীয় অবহেলায় পথভ্রষ্ট হয়েছে। এরপর থেকেই শ্রমিক-ছাত্র বিক্ষোভের মাধ্যমে মিসরীয়রা নিরাপত্তা বাহিনীর সংস্কারের দাবি তুলেছিল। যুদ্ধে পরাভূত সামরিক কর্মকর্তারাই বিক্ষোভকারীদের লঘু হলেও শাস্তি দান করতে থাকলে উত্তেজিত বিক্ষোভকারীরা মিলিটারির একটি বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণীর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা এবং গোয়েন্দা সংস্থার নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রের পরিসমাপ্তির দাবিতে সোচ্চার হয়েছিল। বিকল্প হিসেবে তারা তুলে ধরেছিল দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের জন্য একটি বিপ্লবী সংগঠনের উদ্ভাবন।
কিন্তু মিসরে সামরিক পরাজয়ের বিপর্যয়ের পর মন্ত্রিসভায় সামরিক বাহিনীর সদস্যদের অনুপাত শতকরা ৬৬ ভাগ থেকে ২২ ভাগে নেমে যায়। ১৯৭৫ সাল নাগাদ তা আরো হ্রাস পেয়ে ১৫ ভাগে নেমে আসে। সত্তরের দশকে মিসরীয় অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিতে অনেক পরিবর্তন হওয়ায় সামরিকই স্টাব্লিশমেন্ট রাজনৈতিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্তই শিরোধার্য করে। ১৯৮৬ সালে সামরিক বাহিনী আধাসামরিক নিরাপত্তা বাহিনীর বিদ্রোহ দমনেও হস্তক্ষেপ করেছিল। আশির দশকের শেষ ভাগে ও নব্বইয়ের দশকের শুরুতে মিসরীয় সরকারের জন্য হুমকির উৎস সামরিক বাহিনী ছিল না, বরং তার স্থান নিয়েছিল ইসলামি জঙ্গি গোষ্ঠী। এই জঙ্গিরা আর্মির নিম্ন ও মধ্যস্তরে অনুপ্রবেশের প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছিল।
ইসলামি লিবারেশন পার্টি নামক এক জঙ্গি গোষ্ঠী প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতকে উৎখাত করার চেষ্টা করেছিল। অন্য একটি জঙ্গি সংগঠন জিহাদ আল জুমার নামে গোয়েন্দা সংস্থার কর্নেলের নেতৃত্বে সাদাতকে হত্যা করতে সক্ষম হয়। এই পর্যায়ে যদি আর্মি ক্ষমতা গ্রহণ করে, তারা দেশকে খুব একটা কিছু দিতে পারবে না বলে তারা জানে। তাদের কাছে মিসরের পুঞ্জীভূত ঋণ পরিশোধের কোনো উপায় জানা নেই। জানা নেই সামাজিক অস্থিরতা এবং গোষ্ঠীগত বিভেদ ও তজ্জনিত উত্তেজনার কোনো সমাধান। আর্মি জানে যে, দেশের বিশাল বেকারত্ব দূরীকরণে তাদের কাছে কোনো জাদু নেই। সর্বোপরি মিসরের দীর্ঘ দিনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ককে স্থিতিশীল রাখারও কোনো মন্ত্র নেই আর্মির কাছে।
২০১০ সালের শুরুতে হোসনি মোবারক জোর দিয়েই বলেছিলেন, তিনি বিশ্বাস করেন না যে আর্মি প্রেসিডেন্সির জন্য কোনো বেসামরিক প্রার্থীর বিরোধিতা করবে। কিন্তু যে বেসামরিক প্রার্থীর কথা তার মনে ছিল তিনি হলেন তারই পুত্র গামাল মুবারক, বিরোধীদলীয় নেতা এল বারাদি নন। তবে আর্মির বিরোধিতা না করা সংক্রান্ত তার ধারণা সত্যই ছিল। আর্মি বর্তমানের প্রেক্ষাপটে আর প্রেসিডেন্সিতে আগ্রহী নয়। কিন্তু কিছু বিষয়ে আর্মি এখনো আগ্রহী।
প্রথমত, আর্মির জন্য ভর্তুকি ব্যবস্থার প্রলম্বন, যা ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি থেকে আর্মিকে সুরক্ষা দেবে। মার্কিন অর্থায়নে সৃষ্ট এক প্রচণ্ড অর্থলিপ্সা শুধু মোবারক বা তার অনুগত জেনারেলদেরকেই নয়, সমগ্র আর্মিকে সংক্রমিত করে রেখেছে। আর্মির কর্মকর্তা শ্রেণী মিসর-মার্কিন মৈত্রীর দিনগুলোতে দেখেছে যে, কায়রোর আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গ্র্যাজুয়েট সিটি ব্যাংক জাতীয় কোনো করপোরেশনে চাকরি করে একজন জেনারেলের চেয়ে চার গুণ অধিক রোজগার করতে পারেন।
তবে তাদের অন্তরে লালিত একপ্রকার ভোগবাদের পূর্বশর্ত হলোÑ দেশে স্থিতিশীলতা। যে মহলই সেই স্থিতিশীলতার বিধান করতে সক্ষম, রাষ্ট্রক্ষমতা তাদের হাতে চলে যাওয়ায় মিসরীয় সামরিক বাহিনীর কোনো ক্ষোভ বা দুঃখ নেই। 
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার এবং নিরাপত্তা, রাজনীতি, বৈদেশিক নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক

শনিবার, ১৬ জুন, ২০১২

দোহাই, আমাদের আশা ও বিশ্বাসের ভিত ভাঙবেন না


এম আবদুল হাফিজ
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের জনপ্রিয়তা কমেছে, তবে ঠিক কতটা কমেছে তা শুধু আগামী সাধারণ নির্বাচনে বোঝা যাবে। সমস্যা যে, একথা কবুল করতেও ক্ষমতাসীনদের অনীহা। বিগত যৌবন নর-নারী যেমন নানাভাবে তাদের যৌবনকে অপরিবর্তিত দেখানোর চেষ্টা করে, তেমনি মহাজোট বিশেষ করে আওয়ামী লীগ তাদের জনপ্রিয়তা অক্ষত রাখার সার্টিফিকেট সংগ্রহে ব্যস্ত। কিছুদিন আগে কোথায় না কোথায় প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের গ্যালাপ জরিপে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয়তার শীর্ষ অব¯’ান নিয়ে শেখ হাসিনা গণভবনে তার নিয়মিত মিথষ্ক্রিয়ায় গর্বও করেছেন, যদিও আমরা এ দেশবাসী ভিন্ন চিত্র দেখছি। দেখছি আওয়ামীদের জনপ্রিয়তা তথা ক্ষমতা ধরে রাখার প্রাণান্ত প্রচেষ্টা। যদিও সে সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে।
আওয়ামীরা তাদের ছিয়ানব্বইয়ের মেয়াদ শেষেও অনেক কূটকৌশল এঁটেছিল। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন তাদের কিছু অনৈতিক আবদার মেনে না নেয়ায় তার সঙ্গে আওয়ামীদের মনোমালিন্যও হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত তিক্ততায়ও পর্যবসিত হয়। এতদসত্ত্বেও ‘জনতার মঞ্চ’ ইত্যাদির মাধ্যমে অর্জিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার তখন বহাল থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ পরবর্তী নির্বাচনে (২০০১ সাল) পুনর্নির্বাচিত হওয়া সম্বন্ধে নিশ্চিত হতে পারেনি। তাই তারা বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের শরণাপন্ন হয়েছিল প্রশাসনিক বেশ কিছু বিন্যাসের জন্য, যা নির্বাচনকে তাদের অনুকূলে প্রভাবান্বিত করবে।
অবশ্য এমন অপকর্ম বিএনপিও করেছিল যা বিরোধীদের তত্ত্বাবধায়ক আন্দোলনকে উসকে দিয়েছিল। একতরফাভাবে দলটি বিচারপতি সাদেককে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দিয়েছিল। উদ্দেশ্য একই, নির্বাচনকে প্রভাবান্বিত করা। প্রবল আন্দোলনের মুখে একটি প্রহসনের নির্বাচন হলেও এবং বিএনপি তাতে জিতলেও ওই ‘নির্বাচিত’ সরকার তড়িঘড়ি সংসদে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির প্রবর্তন করে সংসদ ভেঙে দেয়। তত্ত্বাবধায়কের গণদাবির জোয়ারে আওয়ামী লীগ সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতায় কোনমতে ক্ষমতা লাভ করে। কিš‘ ঠিক বিএনপির ব্যর্থ অপকৌশলের মতো বিগত মেয়াদেও আওয়ামী লীগের অপকৌশলের ফলও নেতিবাচক হয়েছিল।
দেখা যা”েছ যে উভয় দলÑ বিএনপি ও আওয়ামী লীগ ব্যর্থ সরকার পরিচালনার পর তাদের নাজুক অব¯’া ঠিকই উপলব্ধি করে এবং তা কবুল করে শোধরানোর পথ খোঁজার পরিবর্তে অপকৌশলে লিপ্ত হয়। আওয়ামী লীগ এ মুহূর্তে সেটাই করছে। এরই মধ্যে আরেক সংশোধনীর মাধ্যমে দলটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথা প্রত্যাহার করেছে। সেই আগের মেয়াদের ধাঁচেই প্রশাসন তাদের অনুকূলে বিন্যস্ত করেছে। আওয়ামী ক্যাডারদের যুক্ত করে গড়ে উঠেছে আইন-শৃংখলা রক্ষাবাহিনী। সব শিক্ষা-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে কৌশলে গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল স্তাবক-গোষ্ঠী, যাদের কাজই হল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবারকে মহিমান্বিত করা। সরকার থেকে প্রদত্ত উ”িছষ্টের বিনিময়ে এরা সরকারের পক্ষেই কাজ করবে বলে ধরে নেয়া যায়। কিছুটা অন্যরকমভাবে বিএনপিও প্রশাসনের রাজনীতিকরণ ছাড়াও শিক্ষা-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাদের প্রভাব বিস্তার করেছিল।
কিš‘ অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, এ কৌশল শেষ পর্যন্ত টেকে না। কেননা উ”িছষ্ট ভাগাভাগির লড়াইয়ে এরা অন্তর্দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। তাছাড়া যারা সুবিধাভোগী মোসাহেব, তারা তো আসলে মৌসুমি পাখি। মৌসুম ফুরিয়ে গেলে তারাও অন্তর্হিত হয়। অতীতে আওয়ামী লীগসংশ্লিষ্টদের দেখেছি দল ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হলেই এরা কোথায় যেন হারিয়ে যায়। সরীসৃপের মতো জড়-নিষ্ক্রিয় অব¯’ায় পড়ে থাকে। এখন যারা নেতানেত্রীদের ঘিরে স্তাবকতায় মত্ত তাদের আর ক্ষমতাহীন দলের জন্য মাঠে-ময়দানের রাজনীতিতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর এমনই দেখা গিয়েছিল। আমার মনে আছে, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সাফল্য যখন মধ্যগগনে, যে কেউ যে কোনভাবে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সম্পৃক্ততা প্রদর্শনে তাদের সংরক্ষিত সামান্যতম প্রমাণও উপ¯’াপন করতে প্রাণপণ চেষ্টা করত।
আবার ঠিক উল্টো চেষ্টা দেখেছি তার নিহত হওয়ার পর। কোনদিন কোনক্রমে বঙ্গবন্ধুর সংস্পর্শে এসে থাকলেও সেই ‘অনভিপ্রেত’ স্মৃতি মুছে ফেলার প্রাণান্তকর চেষ্টা। এখন আবার হিসাব করে রাজনীতি করার যুগ এসেছে যাকে বলে ‘রিয়ালপলিটিকে’র সময়। এখন তো পাওনা অগ্রিম বুঝে নিয়েই নবাগতরা রাজনীতির মাঠে পা বাড়ায়।
আওয়ামী তথা মহাজোটের যে আপাতত গ্রহণযোগ্যতায় ধস নেমেছে তা শুধু আন্তর্জাতিকভাবেই স্বীকৃত বা প্রচারিত নয়, দেশের অভ্যন্তরে চোখ-কান খোলা রাখলেই তা বোঝা যায়। পথ চলতে রিকশাওয়ালার সঙ্গে কথা বা গ্রামগঞ্জে টংয়ের আড্ডায় সমবেত লোকজন কী বলেন, সেদিকে মনোযোগী হলেই আওয়ামীদের কীর্তিকাহিনীর ফিরিস্তি ও জনমনে তাদের অব¯’ান সম্বন্ধে জানা যায়। আর মিডিয়া তো আছেই। মিডিয়ার সংবাদদাতা, বিশ্লেষক ও প্রতিবেদকরা একটি অসাধারণ শ্রেণী। সাহসী, মেধাবী ও তথ্যসমৃদ্ধ। তারাও জনগণকে সরকারের কীর্তিকাহিনী সম্বন্ধে জানাতে সাহায্য করেন।
এটি একটি কমনসেন্সের ব্যাপার, যে সরকার সাড়ে তিন বছর চলেছে বা এখনও চলছে তার সম্বন্ধে জনগণ কী ধারণা পোষণ করবে। যে প্রাক-নির্বাচন সাজে আওয়ামী লীগ সরকারকে সাজিয়েছে তাতে এরই মধ্যে আওয়ামীদের জন্য কারচুপির ক্ষেত্র তৈরি হয়ে আছে।
এরপর সেই ক্ষেত্র ভোট চুরির জন্য আরও উর্বর হবে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে, যার প্র¯‘তি সমানে চলেছে। চলেছে এক দানবীয় দমননীতি। বিরোধী দলের সব শীর্ষ নেতার ওপর ঠুকে দেয়া হয়েছে অ-জামিনযোগ্য বিস্ফোরক মামলা, যাতে হাবুডুবু খা”েছন দলের অন্য নেতাকর্মীরা। এই নাকি একটি দেশের গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পটভূমি? কেউ স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারবে না, জনমত গঠন করতে পারবে না বা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারবে না। করলেই ঠুকে দেয়া হবে মামলা। লেলিয়ে দেয়া হবে পুলিশ, যাদের নির্যাতনে নির্বাচনের মাঠ ছাড়বে বিরোধীরা।
সংবাদপত্রে পড়ি পুলিশ-আতংকের কথা। কথা তো ছিল পুলিশ হবে আমাদের বন্ধু। তাদের আতংকের ব¯‘তে পরিণত করা হয়েছে। এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে! পুলিশ কী না পারেÑ গুম, অপহরণ, প্রয়োজনে হত্যা। এমনিভাবেই রাজনীতিকরা তাদের ব্যবহার করেছেন! আরও হতাশাব্যঞ্জক পুলিশের সম্বন্ধে তাদের মন্ত্রীদের বচন। সবকিছু মিলিয়ে বর্তমান পরিবেশ অবশ্যই নির্বাচনবান্ধব নয়। এ পরিবেশে কোন গণতান্ত্রিক নির্বাচন হতে পারে না। নির্বাচন যে কোন গণতান্ত্রিক দেশে একটি উৎসব। এতে দেশের জনগণ, যারা সর্বক্ষণই অবদমিত, তারা স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে ভয়ভীতির তোয়াক্কা না করে ভোট দেবে।
দেশের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলই পালাক্রমে দেশ ও সমাজের অনেক ক্ষতি করেছে। সবচেয়ে মারাÍক যে ক্ষতিটা করেছে তা হল জনগণের আশা ও আ¯’ার ভিতটাকে তারা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। আমরা এখনও আশাবাদী হতে চাই। কিš‘ বর্তমান ধারার রাজনীতি তা হতে দেবে না। আওয়ামী লীগ আমাদের শুধু দুঃখ, দারিদ্র্য, বৈষম্য, দুর্নীতিই দিয়েছে, আরও দিয়েছে সীমাহীন দুর্ভোগ। বিএনপি এর চেয়ে ভালো কিছু দেবে, তারও সম্ভাবনা নেই।
জনগণ তাদের সান্ত্বনার জন্য নিরপেক্ষ একটি নির্বাচনের অপেক্ষায় তাকিয়ে আছে। এমন একটি নির্বাচন, যাকে ঘিরে ক্ষমতাসীনদের কারচুপি করার কোন সম্ভাবনা থাকবে না বা সরকারি দল প্রভাব খাটাতে পারবে না। দুঃখজনক যে, আওয়ামীরা উল্টো হাঁটা দিয়েছে এবং ক্ষমতা পুনর্দখলে মরিয়া হয়ে উঠেছে। কিš‘ তেমনটি ঘটাতে সক্ষম হলে একুশ শতকের বাংলাদেশে তারা তা কিছুতেই হালাল করতে পারবে না। আমি বলি না যে, আওয়ামীরা দেশের জন্য কিছুই করেনি। কিš‘ তাদের প্রতিশ্র“তির ক্ষুদ্র ভগ্নাংশও তাতে পূরণ হয়নি। তাহলে নবম সংসদ নির্বাচনের আগে কেন প্রতিশ্র“তির এত ফুলঝুরি? ঙহষু ঃড় ঃধশব ঃযব 
ঢ়বড়ঢ়ষব ভড়ৎ ধ ৎরফব? তবু আশা করতেই থাকব যে ভালো কিছু ঘটবে।
কিš‘ বর্তমানে ক্ষমতার দণ্ড যাদের হাতে তারা তো উঠেপড়ে লেগেছেন, জিততে তাদের হবেই। এ বাসনা সম্বন্ধে তাদের কোন রাখঢাক নেই। অনেক দিন আগে থেকেই আওয়ামীদের নির্বাচনী কাউন্ট-ডাউন শুর“ হয়েছে। তারই সমান্তরালে সক্রিয় করা হয়েছে আওয়ামীদের নির্বাচন পরিচালনা কমিটি। এ কমিটি তাদের ধানমণ্ডির অফিসে নির্বাচনী কৌশলগুলোকে শাণিত করছে। এর বিপরীতে প্রধান বিরোধী দল কোন নির্বাচনী ভাবনা তো দূরের কথা, এখনও কঠোর দমননীতির কবলে পর্যুদস্ত। বিএনপিবিরোধী অভিযোগ যথা সচিবালয়ে বিস্ফোরক নিক্ষেপ ও প্রধানমন্ত্রীর দফতরের সামনে গাড়ি পোড়ানো মামলায় গোয়েন্দা পুলিশ অতি দ্র“ততার সঙ্গে চার্জশিট দিয়েছে। এর অর্থ, কোন নির্বাচনী তৎপরতা থেকে বিরোধী দলকে বি”িছন্ন রাখা এবং এ সুযোগে প্রাক-নির্বাচনী তৎপরতায় ক্ষমতাসীনদের দৌড়ে এগিয়ে থাকা।
প্রাক-নির্বাচনী এ অপতৎপরতায় ক্ষমতাসীনদের ভূমিকায় প্রকটভাবে লক্ষণীয় সাংবাদিক নির্যাতন ও পুলিশনির্ভরতা। সাংবাদিকরা তাদের নিয়মিত প্রতিবেদনে জনসমক্ষে তুলে আনছেন সরকারের দ্বিমুখীনীতি, মেয়াদ শেষে অনুগতদের পারিতোষিক প্রদানে দুর্নীতির এক প্রকার মহোৎসবের কথা এবং প্রশাসনকে আপাদমস্তক রাজনীতিকরণের অজ্ঞাত কাহিনী। তারাই ফাঁস করে দি”েছন হাজারো অনিয়মের কথা, যার কারণে দেশ শাসনের নামে আওয়ামীদের গণ-লুটপাটের ম”ছব চলছে এখন। স্বভাবতই এসব কারণে সাংবাদিকরা এখন সরকারের চক্ষুশূল। তাই তাদের ওপর পুলিশ ছাড়াও অজ্ঞাত অপরাধীদের চোরাগোপ্তা ও অতর্কিত হামলা। সাগর-র“নী এপিসড তো রহস্যই থেকে গেল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাগর-র“নী বা ইলিয়াস আলী সম্বন্ধে কিছুই বলা যাবে না।
আমরা জনগণ এখনও সরকারের ভালোত্বে বিশ্বাস করতে চাই, এ দেশের অমিত সম্ভাবনায় আ¯’া রাখতে চাই। পুলিশের ‘দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালনে’ বিশ্বাস রাখতে চাই, কারণ তারা তো এ দেশেরই সন্তান। বিশ্বাস রাখতে চাই যে, এ দেশ একদিন দুর্নীতিমুক্ত হবে, দারিদ্র্যমুক্ত হবে এবং আর্থ-সামাজিক সমতার নিদর্শন হবে। কিš‘ আফসোস, সরকারের অব্যাহত অপকর্মে সেই বিশ্বাসগুলো ক্রমেই বিলীন হয়ে যা”েছ।
স্বাধীনতার চার দশক পরে ব্যক্তিজীবনে প্রৌঢ়ত্বের দ্বারপ্রান্তে এসে এই বাংলায় যা আমাকে লালন করেছে, স্বপ্ন দেখিয়েছে এবং আশায় বুক বাঁধতে শিখিয়েছে, সেই মাতৃভূমিকে জড়িয়ে কাঁদতে ই”েছ করে এবং এ দেশের রাজনীতির নামে লুণ্ঠনকারীদের বলতে ই”েছ করে : চাইলে সবকিছু লুটেপুটে নাও কিš‘ আমাদের আশা ও বিশ্বাসের ভিতকে দোহাই লাগে, তোমরা ভেঙো না!
এম আবদুল হাফিজ : নিরাপত্তা বিশ্লেষক, কলাম লেখক

এম আবদুল হাফিজ
অন্তত প্রধান দুই দলের রাজনীতিতে নেই কোনো অভিনবত্ব বা বৃত্তবন্দি রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার সাহসী উদ্যোগ। শীর্ষ নেতৃত্ব ভুগছে প্রতিহিংসার এক প্রকার দুরারোগ্য বিকারে। সম্প্রতি ১৮ দলীয় জোটের গণসমাবেশ এবং তা ভণ্ডুল করতে মহাজোট তথা আওয়ামী লীগের প্রাণান্তকর চেষ্টা সেটাই প্রমাণ করল। ফরাসি অভিব্যক্তি 'ডেজা ভ্যু', যা বহুল পরিচিত কোনো কিছুর পুনঃদর্শন বোঝায়। সেই অনুভূতি নিয়েই দেখলাম ১১ জুনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের অঘোষিত হরতাল ও সমাবেশে বিএনপির অক্ষম আস্ফালন। দেখলাম সেই বহুল পরিচিত রাজনৈতিক দৃশ্যপট, যা আমরা গত দু'দশকের 'গণতান্ত্রিক' বাংলাদেশে দেখে আসছি। অবশ্য বিএনপির মেয়াদেও এসব ছিল। তবে এখনকার দুর্বল এ সংগঠনটিকে আরও দুর্বল করতে এবং বেকায়দায় ফেলতে আওয়ামী লীগ যেসব হয়রানিমূলক পদক্ষেপ বেছে নিয়েছে তা জিঘাংসারই বহিঃপ্রকাশ। স্পষ্টতই বিএনপিকে অনিশ্চয়তায় ভোগাতে বা শেষ সময়ের প্রস্তুতিতে দলটিকে বেকায়দায় রাখতে কর্তৃপক্ষ শেষ দিনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ঝুলিয়ে রেখেছে বিএনপিকে সমাবেশ করার অনুমতি না দিয়ে। বিরোধী দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে মামলায় জড়িয়ে আন্দোলনের গতি ও গতিবেগ স্তিমিত করার অপচেষ্টার কথা বাদই দিলাম। যতক্ষণ আওয়ামী লীগের হাতে সেসব করার ক্ষমতা আছে, তারা তা করবেই। বিশেষ করে যখন বিএনপিও ক্ষমতায় থাকতে সেসব করেছে। শুরুতেই বলেছি, সেই একই প্রতিহিংসার রাজনীতির বৃত্তে এ দেশ ঘুরছে, যা প্রশমিত হওয়ার পরিবর্তে মাঝে মধ্যেই জিঘাংসার পর্যায়ে পেঁৗছে যায়।
গণসমাবেশ নিয়ে শুরু করেছিলাম। যদি ক্ষমতাসীনদের সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতার বিষয়টি বিবেচনায় আনা যায়, তাহলে এ সমাবেশে বিএনপির সাফল্য শতকরা ১০০ ভাগ। যদিও নিন্দুকরা সুচের পেছনে ছেদা আবিষ্কারেও ব্রতী হয়েছে। বিএনপির একটি 'ক্যালিব্রেটেড মডারেশন'কে তাদের কাছে অক্ষম আস্ফালন মনে হয়েছে। তবে বিজ্ঞজনদের মতে, বিএনপির মডারেশন সময়োচিত হয়েছে।
একটি চলমান আন্দোলনের গতি, প্রকৃতি এবং কৌশল রাজনীতির অনেক উপাদানই নির্ণয় করে থাকে। রমজান মাসের প্রাক্কালে এবং গ্রীষ্মের এই তাবদাহে আন্দোলনের কোনো কঠোর পদক্ষেপ বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল জনগোষ্ঠীর কাছেও বিরক্তিকর হতো। তাছাড়া আন্দোলনের মেজাজকে ধরে রাখতে নেতৃত্বকে অনেক কথা বলতে হয়, যা অনেক সময় বাস্তবায়নের ঊধর্ে্ব। আওয়ামীরা এত সত্বর তাদের হাস্যকর ট্রাম্পকার্ড রাজনীতির কথা ভুলে গেল?
আমার কাছে হাস্যকর লাগে, যখন বাঘা বাঘা আওয়ামীকে বলতে শুনি, আসলে বিএনপির আন্দোলনের কোনো ইস্যু নেই। প্রকৃতপক্ষে ইস্যুর আধিক্যে বিএনপির জন্য সবচেয়ে মারাত্মক ইস্যু বাছাই দুরূহ হয়ে পড়েছে। শুধু দেশের সামাজিক শৃঙ্খলা ও অবক্ষয়ের বিষয়টিই যদি ধরা যায় এর বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা নিয়ে বছরের পর বছর আন্দোলন চলতে পারে। যুগ যুগ ধরে যে কোনো গণতান্ত্রিক দেশে এসব নিয়ে আন্দোলন দেশবাসীর গণতান্ত্রিক অধিকার। ক্ষমতাসীনরা দেশের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে ব্যর্থতার ভেতর দিয়ে সমস্যাগুলোকে এতটাই লেজেগোবরে করে ফেলেছে, সেগুলোকে সুবিন্যস্ত করে একটি শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে অফফৎবংং করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
আমরা উৎসুক এমন পরিবর্তন দেখতে, যার মধ্যে মেধা ও পরিপকস্ফতার ছাপ থাকবে। আন্দোলন মানেই রাজপথভিত্তিক উত্তাপ নয়, সেটা তো সংসদের পরিসরেও হতে পারে। বিএনপির মধ্যে বেশকিছু প্রতিশ্রুতিশীল পার্লামেন্টারিয়ান আছেন, যাদের বুদ্ধিমত্তার উপস্থাপনা জাতি দেখতে চায়। গণতন্ত্র কিন্তু সবসময়ই সংখ্যাতত্ত্বের ওপর নির্ভরশীল নয়। শানিত বুদ্ধি, যুক্তি ও বাগ্মিতা অনেক সময় একটি দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। তেমন কিছু পার্লামেন্টারিয়ান পাকিস্তান আমলে রাওয়ালপিন্ডিতেও সংসদের ফ্লোর কাঁপাত। আমরা আমাদের সংসদে সেসব উত্তপ্ত বিতর্কের ট্র্যাডিশন ফিরিয়ে আনতে পারি না কেন? আমরা সবসময়ই সংসদে শুধু স্তুতি, বন্দনা ও স্তাবকতাই দেখব?
আমরা প্রায় ভুলে যেতে বসেছি যে, প্রয়াত শহীদ সোহরাওয়ার্দী তার ব্যক্তিত্ব ও কৌশলে সামান্য কয়েকজন সদস্যের সমন্বয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্বের আসন দখল করেছিলেন। যে কোনো দলের জন্য সদস্য সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু গুণগতভাবে উন্নত একটি সরকার গঠনে গুণী এবং যোগ্য সাংসদ কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
বোঝা যায়, বিএনপি এখন মার্কটাইম করে নির্বাচন নিকটবর্তী হলে তুরুপের তাসটি ছাড়তে চায়_ আন্দোলন বা নির্বাচনে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে চায়। ইতিমধ্যে যদি দলটি সংসদের সঙ্গে খানিকটা সংশ্লিষ্ট হয়, তা হবে বাড়তি অর্জন।

ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম আবদুল হাফিজ
সাবেক মহাপরিচালক বিআইআইএসএস ও কলাম লেখক

শুক্রবার, ৮ জুন, ২০১২

মহাজোটের 'ফেইট অ্যাকমপ্লি' অর্জিত হয়নি


এম আবদুল হাফিজ
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের দৃষ্টি এখন সামনে। স্বভাবতই জোট এখন আগামীর হিসাব-নিকাশ কষছে। আসন্ন নির্বাচনে তার প্রসপেক্ট এবং তা আশানুরূপ না হলে গৃহীতব্য ব্যবস্থাগুলো এ সময়ে জোট অন্তর্ভুক্ত দলগুলোর নীতিনির্ধারকদের বিবেচ্য। জোটপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রীর জন্য বেশ আগেই নির্বাচনের কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে। তার উক্তি ও মেজাজে পরিস্ফুট যে, আগামী নির্বাচনটিও জিততে তিনি মরিয়া। একইভাবে মরিয়া বিরোধী দল ও তার নেত্রী খালেদা জিয়াও। কিন্তু জিতবে তো শুধু একটি পক্ষই। জেতার কৌশল নির্ধারণে বিরোধী দলের অনেক সীমাবদ্ধতা ও প্রতিবন্ধকতা, যার মধ্যে বিএনপি নিতৃত্বাধীন ১৮ দল এখন ফেঁসে আছে। পক্ষান্তরে ক্ষমতাসীনদের হাতে প্রাক-নির্বাচনী তৎপরতার জন্য অনেক কার্ড মজুদ আছে।
মহাজোট এখন একের পর এক সেই কার্ডই খেলছে। বিরোধী দলকে কোণঠাসা করতে ক্ষমতাসীনরা বিরোধীদলীয় শীর্ষ নেতাদের ইতিমধ্যে অজামিনযোগ্য মামলা দিয়ে কারার অন্তরালে পাঠিয়েছে। প্রচণ্ড দমননীতির জাঁতাকল এড়াতে বাকি নেতাকর্মীরাও ব্যাপকহারে গা-ঢাকা দিয়েছেন। ফলে রাজনীতির মাঠে এখন ক্ষমতাসীনরাই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
কিন্তু তলে তলে ক্ষমতাসীনরা যে মারণাস্ত্রটি বিরোধীদের জন্য উঁচিয়েছে তা হলো নির্বাচন কার অধীনে হবে তার একটি আইনি ও সাংবিধানিক সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে। বিগত কয়েকটি নির্বাচন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে হলেও মহাজোট ক্রমবর্ধমান ব্যর্থতায় ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে আর তত্ত্বাবধায়কের ওপর ভরসা করতে পারছে না। যে আওয়ামীরা একযুগ আগে তত্ত্বাবধায়কের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল, তাদেরই এই পদ্ধতিতে এখন অরুচি কোনো শুভ সংকেত বহন করে না।
এক অনুগত বিচার ব্যবস্থার সহায়তায় এবং সংসদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এ ইস্যুতে তাদের সাফল্য আওয়ামীদের একটি ফেইট অ্যাকমপ্লি অর্জিত হয়েছে বলে তারা ভেবেছিল। আরও ভেবেছিল যে, এভাবে পরিবর্তিত একটি পদ্ধতি অর্থাৎ দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে_ এ জন্য যে কেউ আরেকটি আইনি ও সাংবিধানিকভাবে সেটল্ড ইস্যু নিয়ে উচ্চবাচ্য করবে না। কিন্তু তেমনটি না হয়ে এখন নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতিই চলমান রাজনীতির সবচেয়ে বিতর্কিত ইস্যু। যদিও আত্মপ্রসাদে মগ্ন আওয়ামীরা এ ইস্যুতে বিরোধীদের কোনো পাত্তাই দিতে চাইছে না এবং একটি চণ্ডনীতির মধ্য দিয়ে বিরোধীদের দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচনের সিদ্ধান্তটিই গেলাতে চাইছে। কিন্তু সামষ্টিকভাবে তা হবে এই জটিল ইস্যুর একটি হাস্যকর সরলীকরণ।
দেশ-বিদেশের সকল মহল থেকেই সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবি এখন সর্বজনীন। মুখে আওয়ামীরা যতই হম্বিতম্বি করুক না কেন বাস্তবে দলের শক্তিতে, জনপ্রিয়তায় এবং গ্রহণযোগ্যতায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমানে সমান। কোনোটিকেই কোনোটির চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল ভাবা যাবে না। বাংলাদেশে আগ্রহী যে কোনো দেশ এবং দেশের অভ্যন্তরে সব মহলই এ সত্যটি অনুধাবন করে। কোনো সঙ্গত কারণে যদি বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক স্থাপত্য মুখ থুবড়ে পড়বে এবং এ দেশের সব গণতান্ত্রিক সম্ভাবনাই বিলুপ্তির মুখে পড়বে। তাই আগামী নির্বাচন কোন সরকারের অধীনে হবে, তা নিয়েই এত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।
বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অভিযাত্রা কখনোই মসৃণ বা কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। কিন্তু মহাজোটের আগামী নির্বাচনে জয়ের বিকার এবং অদম্য লিপ্সা জোটটিকে দিগ্গি্বদিক জ্ঞানশূন্য করে তুলেছে এবং অবাস্তব নির্বাচনী কৌশল প্রণয়নের পথে ঠেলে দিয়েছে। ফলে তা গ্রাউন্ট রিয়ালিটি থেকে সম্পূর্ণভাবে ছিটকে পড়েছে। এর আগে চারদলীয় জোটকেও এমন দশায় ফেলেছিল। তার পরিণতি আওয়ামী লীগসহ কারও কাছে অজ্ঞাত নয়। মহাজোট কি তাহলে সেই একই পথে এগোচ্ছে এবং একটি এক-এগারোর প্রাদুর্ভাব ঘটানোর প্রেক্ষিত তৈরি করছে?
আওয়ামী লীগ তো কোনো ফেলনা দল নয়। এই দলকে এমনটা মানায় না। দলটি যদি বিরোধীদের সঙ্গে একটি সমঝোতার পথে অগ্রসর হয়, চাই কি তাও আজকের ব্যর্থ মহাজোট সরকারের জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট হবে এবং তাদের নির্বাচনী প্রসপেক্টকে উজ্জ্বল করতে পারে। তার চেয়েও বড় কথা, একটি সমঝোতার পথের সঙ্গে এ দেশে গণতন্ত্রের অস্তিত্বও সম্পৃক্ত হয়ে আছে। কিন্তু যদি ক্ষমতার মদমত্ততায় হার্ডলাইনই প্রধানমন্ত্রীর পছন্দের পথ হয়ে থাকে তার জন্য অন্য অনেক ক্ষেত্র আছে, যেখানে ফলপ্রসূভাবে হার্ডলাইন প্রয়োগ হতে পারে। অন্তত মেয়াদের প্রায় অন্তিম সময়ে এসেও যদি আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট দেশজোড়া বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য ও নজিরবিহীন প্রশাসনিক অনিয়মের বিরুদ্ধে হার্ডলাইন গ্রহণ করতে পারে এবং দুর্নীতি ও দারিদ্র্যের দানবকে পরাভূত করতে পারে, কে জানে তা হয়তো আশাতীতভাবে তাদের নির্বাচনী সম্ভাবনাকে নতুন মাত্রায় পেঁৗছে দিতে পারে। কিন্তু যে কোনো অবস্থায় সাংঘর্ষিক নীতি পরিত্যাজ্য। চরম দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে তার মাশুল জনগণকে দিতে হয়। যাদের কাছে ক্ষমতাকাঙ্ক্ষী দলগুলোকে হাত পাততে হবে। এক্ষুণি ক্ষমতাসীনদের জন্য আত্মসন্তুষ্টির কোনো কারণ নেই। পূর্বাপর বিবেচনায় পুলকিত ও নিশ্চিন্ত থাকার জন্য ক্ষমতাসীনরা 'ফেইট অ্যাকমপ্লির' কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন না যতক্ষণ রাজপথে উত্তাপ স্তিমিত না হয় বা বিরোধী দল রণে ভঙ্গ না দেয়। এখনও অনেক কিছু ঘটার বাকি আছে। এ অবস্থায় ক্ষমতাসীনদের জন্য একমাত্র লাভজনক পথ একেবারেই শেষ বেলায় হলেও জনহিতকর কিছু কাজের উদ্যোগ গ্রহণ এবং বিরোধী জোটের সঙ্গে সমঝোতা। একইভাবে বিরোধী জোটও অনেক ক্ষতি ও দুর্ভোগ থেকে রক্ষা পাবে যদি তারাও 'এক দফার' বা সরকার পতনের আন্দোলন থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয় এবং বড় বড় বুলি আওড়ানো থেকে বিরত থাকে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম আবদুল হাফিজ :সাবেক মহাপরিচালক
বিআইএসএস ও কলাম লেখক

বৃহস্পতিবার, ৭ জুন, ২০১২

দেশে বহুমাত্রিক এক দুঃসময়!


॥ এম. আবদুল হাফিজ ॥


গ্রীষ্মের দাবদাহ, তীব্র লোডশেডিং ও রাজনৈতিক পারদের ঊর্ধ্বমুখীতায় প্রাণ ওষ্ঠাগত এ দেশের মানুষের। কোনো সঙ্কেত নেই যে, শিগগিরই এই অবস্থার কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন হবে। বরং ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অস্থিরতা সরকার থেকে ভিন্ন মতাবলম্বীদেরসহ বিরোধীদলীয় শীর্ষ নেতাদের ব্যাপক ধরপাকড় ইতোমধ্যে ত্রিশঙ্কু অবস্থায় নিপতিত দেশের অস্থিতিশীলতার নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দেশের নেতা-নেত্রীরা বারুদের ভাষায় কথা বলছেন, একে অপরকে শিক্ষা দিতে শাসাচ্ছেন এবং রাজপথ ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডল দখলে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তাদের মধ্যে সংঘর্ষের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠতে পারা মুহূর্তের ব্যাপার। অভিজ্ঞতা বলে যে, এ থেকেই রাজনৈতিক দাবানলের উৎপত্তি হবে। 
তা ছাড়াও নাগরিক জীবনের বেহাল অবস্থা তো আছেই। তা নিয়ে দেশবাসী আর মাথা ঘামায় না। এই জনমের কখন কোন সময়ে দুধকলা সহকারে ভাত বা চিঁড়া খেয়েছিল সেই সুখ স্মৃতির মধ্যে দেশবাসী তৃপ্তি খোঁজে। মহার্ঘতার কশাঘাতে জর্জরিত মানুষের যখন দু’বেলা পেট পুরে খেতে পারাটাই একটা বিরাট বিষয়, কয়েক ঢোক বিশুদ্ধ পানি পান করতে পারলেই তা হয় বিরাট প্রাপ্তি। তাই কখনো বাগে না আসা বাজারের বাজারদর নিয়েও মাথা ঘামায় না মানুষ। পেলে খায়, না পেলে চুরি করে, মার খায়। তা ছাড়া ভিক্ষাবৃত্তি তো আছেই।
তবু দেশবাসী ভোটের প্রাক্কালে হঠাৎ করেই গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী হয়। দেশের শীর্ষ নেতা-নেত্রীরা আসেন তাদের কুঁড়েঘরের দোরগাড়ায় ভোট ভিক্ষা চাইতে। এতে করেই তাদের পলিমাটির মতো মন বিগলিত হয়। একবার এদের ভোটে নির্বাচিত হয়েই সেই যে ডুমুরের ফুল হয়ে যায় দেশের দেশনেত্রী, দেশরতœ ও পল্লীবন্ধুরা, পাঁচ বছরেও এদের আর সাক্ষাৎ মেলে না। সেই সরলপ্রাণ ও অল্পেতুষ্ট দেশবাসীকে বারবার প্রতারিত করে এ দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব। আবার তারা সক্রিয় আগামী নির্বাচনের প্রাক্কালে। 
বলা বাহুল্য, ভোটের লড়াইয়ে আপাত ক্ষমতাসীনরাই এগিয়ে থাকে। হঙ্কার ও শাসানোতে এবারো আওয়ামীরাই অগ্রণী। তাদের তা করার রসদও আছে। ক্ষমতার দণ্ড যতক্ষণ হাতে আছে, তারাই লোককে অবলাইজ করতে পারে। পারে চাকরিবাকরি, ঠিকাদারি, ব্যবসায় ও ভালো নিয়োগ দিতে। কিছুই না হোক, কারো ফাই ফরমায়েশের জন্য হরহামেশা বিদেশ সফরকারী কর্তাব্যক্তিদের সাথে বিদেশে প্রমোদ ভ্রমণের জন্য পাঠাতে পারে। নিদেনপক্ষে গণভবন দর্শনের মওকা করে দিতে পারে খোদ প্রধানমন্ত্রীর অমৃতবাণী শোনার অসিলায়।
অবাক কাণ্ড ঘটেছে আমাদের দেশরতœ প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতায়। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের এক গ্যালাপ প্রতিষ্ঠান বলেছে, দেশে শতকরা ৭৭ ভাগ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাষ্ট্রনায়কদের শীর্ষে রয়েছেন। তাহলে আওয়ামীদের তো কেল্লা ফতেহ। তা হলে আর আওয়ামী নেতা-নেত্রী রোদে গরমে ঘর্মাক্ত কলেবরে এত দৌড়ঝাঁপ করছেন কেন? তা কি অবশিষ্ট শতকরা ২৩ ভাগ জনসমর্থন বিরোধীদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে? হয়তো বা।
কিন্তু আফসোস ! আওয়ামীরা এ দেশবাসীকে এতটাই বিচার-বুদ্ধিবর্জিত মনে করল কেন? দেশজ জনমত জরিপে তাদের জনপ্রিয়তার স্বরূপ বেরিয়ে আসত বলে একটি দুঃশাসনপীড়িত দেশবাসী তাদের দুঃখের কথাই অকপটে বলত বলে? এ পর্যন্ত তাদের আওয়ামী বিরূপতার প্রকাশ ঘটাত বলে? এ দেশের সব দল সংগঠনই ভুয়া সাফল্যের সার্টিফিকেট চায় এবং তা আমেরিকা, ব্রিটেন বা ইউরোপের হলে তারা বেশি আশ্বস্ত হয়, যদিও বা তা ভুয়া। এ দেশের মানুষের সত্য ভাষণ তাদের যম এবং তা তারা সযতেœ এড়িয়ে চলে।
অথচ আমাদের চাইতে কে ভালো বুঝবে যে দুঃশাসনের জ্বালা কী? তাতে কোন কোন দানবের সৃষ্টি হয়, দারিদ্র্য ও বৈষম্যের উৎস কোথায়, দুর্নীতির সংক্রমণ কোথা থেকে হয়। সুরঞ্জিত সেনরা কোন সংস্কৃতির সৃষ্টি? আলো-আঁধারির মতো তার মন্ত্রিত্ব যাওয়া ও আসার মধ্যে কোথাকার কলকাঠি নড়ে। দেশময় এত হত্যা ও অপহরণের রহস্য কী? ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলম উদ্ধার হন না, কিন্তু নদী-জলাশয়, ডোবা-গর্ত ও ক্ষেত-প্রান্তরে এত বেওয়ারিশ লাশের ছড়াছড়ি। পুরো দেশটাকে মনে হয় একটি বধ্যভূমি।
দিন যত পেরিয়ে যাবে, নির্বাচন আরো নিকটবর্তী হবে, ক্ষমতাসীনেরা ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার আরো আনকোরা নতুন নতুন কৌশলের উদ্ভব ঘটাবে। একই ক্ষমতাসীনেরা স্বাধীনতার ঊষালগ্ন থেকে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার ফন্দিফিকিরে লিপ্ত হয়েছিলেন এবং গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠিয়ে একদলীয় শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিলেন। এ কথা অনস্বীকার্য যে, এই দলটিই আবার স্বাধীনতা সংগ্রামেরও নেতৃত্ব দিয়েছিল। এই দলটিই গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের মূলনীতিকে সংবিধানভুক্ত করেও পরে এই নীতিগুলোকে বিসর্জন দিয়েছিল। জনগণ তবু বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে এই দলকে বারবার ক্ষমা করেছে। আওয়ামীরা কি মনে করে যে, জনগণ আবার তাই করবে?
দেশে এখন দুঃশাসন চলছে। শুধু নির্বাচিত পার্লামেন্ট থাকলেই গণতন্ত্র হয় না। গণতন্ত্র না থাকলে দেশে সুশাসনও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। চলমান দুঃশাসনের শেষ কী বা কোথায় অনুমান করাও কঠিন। কেননা দেশে কোনো কিছুর স্বাভাবিক প্রক্রিয়া সক্রিয় নেই। আমি সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজার কোনো ভক্ত-সমর্থক নই, তবু তিনি এক চমৎকার অভিব্যক্তিতে বর্তমান সরকারের কীর্তির প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আওয়ামীরা আর কিছু না পারুক, দেশটিকে ‘লণ্ডভণ্ড’ করে দিয়েছে। হ্যাঁ লণ্ডভণ্ডই বৈকি! সংস্কার সংশোধনের নামে তারা দেশের সংবিধানই শুধু নয়, অনেক মৌলিক ইস্যুতে জনমতের তোয়াক্কা না করে তাদের বা তাদের দেশী-বিদেশী বন্ধুদের স্বার্থে পদক্ষেপ নিয়েছে, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর। জানি না সেই বিচ্যুতিগুলো আদৌ কিভাবে দূর করা যাবে। যদিও বিএনপির ট্র্যাক রেকর্ড খুব ভালো নয়, কিন্তু এ সময়ে দলের মধ্যপর্যায়ের নেতৃত্বে কিছু প্রতিশ্রুতিশীল মুখের সন্ধান মেলে। রাজপথেও তারা দুর্বার। ভবিষ্যতে তারা কিসে পরিণত হবে এ মুহূর্তে তা বোধগম্য না হলেও গণতন্ত্রের খাতিরেই দেশে একটি বিরোধী সংগঠন থাকতেই হবে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে সরকারের একটি চণ্ড দমননীতি বিএনপির যে ক্ষতি করবে তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি করবে গণতন্ত্রের। সরকারের ইচ্ছা ও অনিচ্ছাকৃত বিপথগামিতাকে সে ক্ষেত্রে ধরিয়ে দেয়ার কেউ থাকবে না। সরকার ব্যক্তি ও দলগত স্বার্থ উদ্ধারে ইতোমধ্যেই বেপরোয়া। একটি বিরোধী দলবিহীন রাজনৈতিক শূন্যতায় আদর্শবিচ্যুত সরকারি দল তখন মেয়াদের বাকি সময়টুকু লুটেপুটে আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। তাহলে? সংলাপ? সেও আরেক মরীচিকা, যার পেছনে, হ্যামিলনের বংশীবাদকের পেছনে ছোটার মতো, ছুটছে বিভ্রান্ত কিছু লোক। 
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার এবং নিরাপত্তা, রাজনীতি, বৈদেশিক নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক

সোমবার, ৪ জুন, ২০১২

হ্যামিলনের বংশীবাদকরা!




এম আবদুল হাফিজ
খুব দুর্দিনে আছে এক সময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী বিএনপি। এতটাই যে, কোন মতে দলটি এখন তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে ব্যস্ত। দলটির সব শীর্ষ নেতাই এখন সরকারের গৃহীত হার্ডলাইন বা এক প্রচণ্ড দমননীতির শিকার হয়ে কারান্তরালে। অতি উৎসাহী দলীয় কর্মীরা বিক্ষোভ-আন্দোলন করতে চাইলেও আইন-শৃংখলা বাহিনীর পুলিশ-র‌্যাবসহ আওয়ামী ক্যাডাররা তাদের কোথাও দাঁড়াতেই দেয় না। পিটিয়ে রাজপথ থেকে তাড়িয়ে দেয়। বাদকরা অন্তরালে থাকলেও বাঁশির মূর্ছনা এদের শ্র“তিগোচর হয়েছে এবং তা তাদের বারবার ঘরছাড়া করে। বিএনপির সাম্প্রতিক কর্মসূচিগুলো তা-ই প্রমাণ করে। জ্যৈষ্ঠের দাবদাহ এবং খররৌদ্রের প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে কিছু প্রতিবাদী তর“ণ যেভাবে মারমুখো ‘আইন-শৃংখলা’ বাহিনীর সদস্যদের মুখোমুখি হয়েছে, তা অনেককেই অবাক করেছে। 
অনেকেই বলেন, আওয়ামীরাও এক সময়ে বিএনপির এমন চণ্ডরূপের মোকাবেলা করেছে। সে কথা সত্য। কিš‘ আজকের আন্দোলনের পরিধি বেশ কিছুটা বিস্তৃত। বিষয়টি আর অন্তঃদলীয় নয়। ন্যায়-অন্যায়ের অনেক ইস্যুই এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এর কারণ আওয়ামীরা এক সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য নিয়ে এদেশের মানুষের মননের বিপরীতে কিছু মৌলিক পরিবর্তনে হাত দিয়েছে, যা ঠেকানো একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে পবিত্র দায়িত্ব। সেই দায়িত্ববোধ থেকেও অনেকে প্রতিবাদের কাতারে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দাঁড়ান। অনেকেই তাদের সরল বিশ্বাস থেকে প্রশ্নের সম্মুখীন হন, এদেশ কি আবার বাকশালী আদলে ফিরে যাবে? অনেকে ভাবেন, এ দেশ কি আর আমাদের বিশ্বাসের ভিত্তিতে টিকে থাকবে। 
সময়ের এমনই এক সন্ধিক্ষণে হ্যামিলনের কিছু বাদক তাদের বাঁশিতে তান তুলেছে আরেক লড়াইয়ের জন্য বিদ্রোহী-প্রতিবাদীদের রাজপথে টেনে আনতে। রক্তচক্ষু সরকারের শাসানির মুখেও এরা ঘর ছাড়ছে। প্রত্যয়দীপ্ত কণ্ঠে তাদের সেই একই উ”চারণÑ সময় এখন মিছিলে যাওয়ার। যুগে যুগে এমনটাই হয়েছে। প্রতিবাদীরা তাদের পরিণতি নিয়ে কালেভদ্রে হিসাব-নিকাশ করে। করলে তারা এর প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে চাইত না। এটাকে শুধু এক সুন্দর আগামীর জন্য ঝুঁকি গ্রহণ বললে ভুল হবে। এটা রীতিমতো গ্যাম্বলিং। 
জুয়াতে স্টেইক থাকে। আজকের এই মারমুখী রাজনীতিতেও স্টেইক আছে। এবং তা উভয় প্রধান দলের জন্যই আছে। রাজনীতিতে অনেক কিছুই উহ্য থাকে। প্রকাশ্যে দু’দলই দেশ ও জনগণের জন্য সমর্পিত প্রাণ। উভয়েই গণতন্ত্রকে নিষ্কলুষ করতে চায়। কিš‘ অন্তরে তাদের ক্ষমতা প্রলম্বিত ও দখল করার লিপ্সা। রাজনীতির আরেক গুর“ত্বপূর্ণ পক্ষ জনগণ। তাদেরও রাজনীতির চলমান খেলায় স্টেইক আছে। রাজনৈতিক খেলার সুবাদে তারাও তাদের ভাগ্যোন্নয়নের চেষ্টায় প্রবৃত্ত হয়। এমন একটি দলকে তারা দেশ পরিচালনার জন্য বেছে নেয়, যেটি তাদেরকে তাদের ঈপ্সিত শাসন উপহার দিতে পারে, যদিও অতীতে কোন দলই তা পারেনি বা দেয়নি। তবু তারা একটি আশাবাদ গিয়ে রাজনীতির খেলায় শরিক হয়। 
আওয়ামীদের দিয়েই এদেশে দেশ শাসন শুর“ হয়েছিল। এখন তারা তৃতীয় মেয়াদে দেশ শাসন করছে। তাদের দেশ শাসনের রেকর্ড কোন সময়ই উৎসাহব্যঞ্জক হয়নি। কর্তৃত্ববাদী এ দলটি দেশ ও জনগণের কল্যাণে বেশি কিছু দেয়নি। কিš‘ তাদের উক্তি-উ”চারণে অন্য চিত্র। তারা ক্ষমতায় এলেই নাকি জনগণ কিছু পায়। অন্যরা ক্ষমতায় আসে শুধু লুটপাটের জন্য। এই ‘পাওয়ার’ তাদের নিজস্ব ব্যাখ্যা আছে। কিš‘ আসলে দলীয় নেতাকর্মীরাই কিছু পায়। তারাও তো জনগণের অংশ। কিš‘ জনগণের স্বার্থে আওয়ামীরা কদাচিৎ কিছু করেছে। তারা যে অন্ধকারে ছিল তা আরও ঘনীভূত হয়েছে, তারা যে দারিদ্র্যে ছিল তা আরও প্রকট হয়েছে। 
একই রেকর্ড বিএনপির দেশ শাসনেরও। তখনও ব্যাপক দুর্নীতি, দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্য ছিল। ‘দেশনেত্রী’ তার শাসনামলে একইভাবে ক্ষমতার দাম্ভিকতায় ছিলেন এবং বিরোধীদের তু”ছ-তা”িছল্য তার শাসন-শৈলীর অংশ ছিল। উ”ছৃঙ্খল এক ‘হাওয়া ভবন’ রহস্য কাহিনী এখনও ত্রাসের সঞ্চার করে। সে সময়কার ‘বিদ্যুৎ’ কেলেংকারি, মুদ্রা পাচার এবং স্বজন তোষণ কম নিন্দিত হয়নি। তবে বেগম খালেদা জিয়ার একটি গুণ অনেকেরই দৃষ্টি এড়ায়নি। রাষ্ট্র পরিচালনায় নেতা-নেত্রীদের এবং কর্তাব্যক্তিদের প্রয়োজনে বিদেশ ভ্রমণ জর“রি। কিš‘ এখনকার মতো প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে তাদের বিদেশ ভ্রমণের নামে ‘প্রমোদ ভ্র্রমণের’ এত আধিক্য ছিল না। কেননা খালেদা জিয়া স্বয়ং অনেকটাই ভ্রমণবিমুখ। 
শাসকগোষ্ঠী যে পথেই চলুক না কেন, সরকারের বিচ্যুতি ও বিপথগামিতার বির“দ্ধে সো”চার তো হবেই প্রতিবাদী তার“ণ্য। তাই আন্দোলন কোন কোন সময়ে দলমতের ঊর্ধ্বে থেকে প্রতিবাদের ভাষা উ”চারণ করে। এ মুহূর্তেও তাই হ”েছ এবং হবে। জনজীবনের অশেষ ভোগান্তি রাজনৈতিক ইস্যুর সঙ্গে একাকার হয়ে এক সার্বজনীন ক্ষোভে-দ্রোহে পরিণত হ”েছ। তারই বিস্ফোরণোš§ুখ প্রকাশ আমরা রাজপথে দেখি। অবশ্য ক্ষমতাসীনদের সুসংগঠিত বিক্ষোভ-আন্দোলনে একই প্রকার দ্রোহ থাকবে না বরং এক ধরনের প্রভুভক্তি ও কৃতার্থতার প্রকাশ থাকবে তাদের ‘কার্য সম্পাদনে’। বাংলাদেশ প্রচণ্ড বিদ্রোহী ও হীনতম তাঁবেদারের আবাসভূমি। 
প্রতিবাদীদের কাছে তাদের আন্দোলন-বিক্ষোভ, ন্যায়-অন্যায়ের যুদ্ধে নিষ্কলুষ ন্যায়ের পক্ষে। ন্যায়ের পক্ষে থাকার একটি মনস্তাত্ত্বিক শক্তি আছে, যা ক্ষমতাসীনদের বির“দ্ধে একটি অসম যুদ্ধে প্রতিবাদীদের চালিকাশক্তি জোগায়। একটি অদৃশ্য অপরাধবোধ নেপথ্যে কাজ করে বলে ক্ষমতাসীনদের দলীয় ক্যাডারদের সব সময় যুদ্ধের রক্ষণভাগে থাকতে হয় এবং ‘ভাড়াটে’ ভূমিকায় থাকার হীনমন্যতায় ভুগতে হয় এবং তাদের আচরণ স্বতঃস্ফূর্ততা পায় না। 
পুরো বিষয়টাকে আমরা যে দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখি না কেন, আগামী দিনগুলো অর্থাৎ দশম সংসদের নির্বাচনকাল পর্যন্ত সময়টি ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধই থাকবে। কেননা উভয়পক্ষেই এ সময়ে নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে ঝুঁকি অনেক প্রকট। কোন পক্ষই দায়-দায়িত্বের এই ঝুঁকি নিতে চাইবে না। রাজনীতিকরা হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতো রাজপথ গরম রাখতে স্ব-স্ব কর্মীবাহিনীকে ঘরছাড়া করে রাজপথে জমায়েত করতে তাদের বাঁশিতে এক প্রকার মায়াবী তান তুলবে। এতেই এক অবাধ্য তার“ণ্য দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য হয়ে রাজপথে ছুটবে। 
সংলাপবাদীরা কী করছেন এ সময়ে? হিলারি ক্লিনটন থেকে ড্যান মজিনা এবং আমাদের সুশীলসমাজ ও বিশিষ্টজনেরা? সংলাপ এমনিতে হয় না। সংলাপের পর্যায় পর্যন্ত আসতেও অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। রাজপথে অনেক তুলকালাম ঘটার পরই রথী-মহারথীরা এখন সংলাপের কথা বলছেন, যদিও এর যৌক্তিকতা অনেক আগেই অনুভূত হয়েছিল। সুতরাং এটা বোঝা যা”েছ যে, রাজপথের পর্বটা অসমাপ্ত থাকার কারণেই সংলাপের জিগিরটা উত্থাপিত হওয়ার অপেক্ষায় ছিল। 
মানুষের কল্যাণ অত সহজে না হলেও তার প্রতিবিধানে অনেক চড়াই-উৎরাই আছে। আশাবাদ বুকে পুষে সেই দুর্গম পথ পাড়ি দিতেই হয়। সেই পথ পাড়ি দেওয়ানোর জন্য অক্লান্ত রাজনৈতিক বংশীবাদকরা তাদের বাঁশিতে তান তোলেন। এখনও, এ মুহূর্তেও সেই প্রক্রিয়াই চলমান।
এম আবদুল হাফিজ : নিরাপত্তা বিশ্লেষক, কলাম লেখক

শুক্রবার, ১ জুন, ২০১২

বাংলাদেশে দুই নেত্রীর মেগালোম্যানিয়া

এম আবদুল হাফিজ
খালেদা জিয়ার বিদ্যা-বুদ্ধির পরিমাণ নিয়ে এখন আর কেউ প্রশ্ন তোলে না। তোলা সমীচীনও নয়। যিনি একাধিকবার দেশের প্রধানমন্ত্রিত্বের মুকুট পরিধান করেছেন, তার ওই পদ অলঙ্কৃত করার যোগ্যতা সম্পর্কে কোনো বিতর্ক হাস্যকর। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে 'দুই নেত্রীর দ্বন্দ্ব' শিরোনামে যুক্তরাজ্যের দ্য ইকোনমিস্ট নেত্রীদ্বয়ের তুলনামূলক গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্যের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। স্মৃতি থেকে উদৃব্দত করছি, তাই অবিকল শব্দ চয়নে কিছু ভ্রান্তি থাকলেও থাকতে পারে। দ্য ইকোনমিস্ট লিখেছিল :কযধষবফধ তরধ যধং রসঢ়ৎবংংরাব সধহবৎরংস যিরষব যবৎ ৎরাধষ ঝযবরশয ঐধংরহধ রং সড়ৎব বফঁপধঃবফ ধহফ ষড়াবং ঢ়ড়ষরঃরপধষ ফবনধঃব.
কিন্তু খালেদা জিয়ার ম্যানারিজম বা শেখ হাসিনার বিতর্কপ্রীতি এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। তাদের উভয়ের মধ্যে যে একটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান, তার ওপর কিঞ্চিৎ আলোকপাতই এখানে উদ্দেশ্য। ক্ষমতায় এলেই তাদের মধ্যে যে মারাত্মক মেগালোম্যানিয়ার প্রকাশ ঘটে, সেটাই দেশের রাজনীতিকে অস্থির, অশান্ত ও টালমাটাল করে তোলে। উভয়েরই বিশ্বাস, তারা জনপ্রিয়তা, জনসমর্থন এবং দেশ শাসনের নিখুঁত কারিগর হিসেবে অনেক শক্তির অধিকারী; যদিও বাস্তবে তা দৃশ্যমান নয়। তাদের এ বিশ্বাসই সমঝোতার সব দুয়ার বন্ধ করে দেয়। উস্কে দেয় এক ভয়াবহ সাংঘর্ষিক রাজনীতির। যে অবস্থার কবলে দেশ আজ নিপতিত। অথচ উভয়েরই দুঃশাসন ও ব্যর্থতা দেশবাসীর অজ্ঞাত নয়। জনগণ হাড়ে হাড়ে জানে, দুই নেত্রীকে পর্যায়ক্রমে ক্ষমতাসীন করে কী পরিমাণ খেসারত তাদের দিতে হয়েছে! কিন্তু মেগালোম্যানিয়ায় আক্রান্ত নেত্রীদ্বয়ের এ দেশের ক্ষমতার মসনদে আরোহণ তাদের বিকৃত ধারণায় তাদেরই প্রাপ্য। জনগণ তাদের নেত্রীকে তার প্রাপ্য আসনে ভোটের মাধ্যমে পেঁৗছে দিয়ে শুধু তাদের দায়িত্ব পালন করেছে। এ ধারণায় তাদের ক্ষমতাসীন নেত্রীদ্বয়ের কাজ এখন শুধু তাদের প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা, যার জন্য তাদের নিজ মেধা ও যোগ্যতাই যথেষ্ট। নিজেদের বড় এবং শক্তিশালী ভাবার এ বাতিক বাংলাদেশে রাজনীতির সব অনর্থের মূল। এ বাতিক যে কাউকে রাজনীতিসহ ক্ষমতার যে কোনো লড়াইয়ে বাতিকগ্রস্তকে বেপরোয়া করে তোলে এবং তার বা তাদের মাত্রাজ্ঞান লোপ পায়_ এতে কোনো সন্দেহ নেই। অনেককে অপ্রিয় লাগলেও এমনই এক মাত্রাজ্ঞানহীন রাজনৈতিক সংঘর্ষ এ দেশকে আর্থ-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিয়েছে, যার পরিণতি ভয়াবহ। যেভাবেই হোক, এ প্রবণতাকে ঠেকাতে না পারলে সর্বনাশা সংঘাত দেশের সব সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করবে। এ জন্য দেশের বিজ্ঞজনকে দলবিশেষের জন্য পক্ষপাতকে পরিহার করে দক্ষ রেফারির ভূমিকায় অনতিবিলম্বে নামতে হবে।
খালেদা জিয়া তার বিগত শাসনামলে এমন বাতিকের বশবর্তী হয়ে প্রতিপক্ষের সঙ্গে তুচ্ছাতিতুচ্ছ আচরণ করেছিলেন এবং তা রাজনৈতিক উত্তাপকে শুধু বাড়িয়েছিল। অনেক ফন্দি-ফিকির করেও তিনি বা তার জোট ক্ষমতায় থাকতে পারেনি; না ক্ষমতার প্রলম্বন ঘটাতে পেরেছিলেন। ক্ষমতা প্রলম্বিত করতে একই প্রকার মানসিক বিকারে ভুগছেন এখনকার প্রধানমন্ত্রী। বেগম জিয়ার মতো তিনিও প্রতিপক্ষকে তীব্র-তীক্ষষ্ট কটাক্ষবাণে ঘায়েল করছেন এবং ভাবছেন যে, তার চাতুর্য কেউ বোঝে না। তিনি হয়তো ভাবেন_ তিনি অতি কৌশলী, জনপ্রিয় এবং শক্তিশালী। ক্ষমতার অন্তিম সময়ে এসে সবাই এমন ভাবেন। কিন্তু প্রায় ক্ষেত্রেই বাস্তবতা একই রকম_ শেষ পর্যন্ত তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে তাদের স্বপ্ন, সাধ এবং কল্পনাবিলাস। এ ছাড়া দুই নেত্রীর ক্ষেত্রেই রয়েছে আরেক মারাত্মক উপসর্গ_ নারী নেতৃত্বের জেদ ও একগুঁয়েমি।
যে কোনো দেশে, যে কোনো সময়ে ব্যর্থ সরকারগুলোর জন্য যখন পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যেতে থাকে, তাদের আচরণ ও প্রতিক্রিয়া হয় অভিন্ন। তারা সবকিছুর মধ্যে ষড়যন্ত্র দেখতে পায়, যার ওপর ভিত্তি করে তাদের দমন নীতিগুলো প্রয়োগ হতে থাকে। এ ছাড়া এমন সরকারগুলো শুধু নিজেদের ছাড়া আর কাউকে দেশপ্রেমিক ভাবতে পারে না। হঠাৎ তারা উচ্চকণ্ঠ হয়ে পড়ে এবং হুমকি-ধমকি ও শাসনের আশ্রয় নেয়। এ ছাড়াও পুলিশ-র‌্যাবের ওপর সরকারের নির্ভরতা বেড়ে যায়। তারাও কিছু প্রাপ্তির আশায় কারণে-অকারণে নিরীহ সাংবাদিক, এমনকি আদালতে বিচারপ্রার্থীদেরও পেটাতে শুরু করে।
আদালত প্রাঙ্গণের পুলিশ ক্লাবে এক নারী বিচারপ্রার্থীর শ্লীলতাহানির মতো কেলেঙ্কারি হয়। তার ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। একটি সমর্থনহীন সরকার শুধু পুলিশের এবং স্তাবকদের ওপর নির্ভর করে টিকতে পারে না; ফন্দি-ফিকিরের মাধ্যমে প্রলম্বিতও হতে পারে না। কিন্তু মেগালোম্যানিয়া তো একটি মানসিক ব্যাধি। মানসিক বিকার ইত্যাদি প্রচণ্ড ধাক্কায়ই দূর হয়। যেমন ২০০৭ সালে জোট সরকারের অনেক দেরিতে হলেও হুঁশ হয়েছিল। কেউ কখনও সীমাহীন শক্তির অধিকারী হতে পারে না, যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারে না। কোনো না কোনো সময় তাদের যুক্তির কাছে, ন্যায়ের কাছে অবনত মস্তক হতেই হয়। সমসাময়িক ইতিহাস তার প্রমাণ। গাদ্দাফি অনেক অস্ত্রবল, প্রাণ বাজি রাখা সমর্থক এবং কূটকৌশল দিয়েও শেষ রক্ষা পাননি। তাই নমনীয়তার ভেতর দিয়ে এবং যুক্তির পথ ধরে এগোলে রাজনীতির দুই পক্ষই মুখোমুখি সংলাপে জটিল সমস্যার জট খুলতে পারেন। সেটিই হবে নেত্রীদ্বয়ের বিকারমুক্ত চিন্তার পরিচায়ক।

ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম আবদুল

হাফিজ :সাবেক মহাপরিচালক বিআইআইএসএস ও কলাম লেখক